গুচ্ছকবিতা।। খৈয়াম কাদের।। poems by khyam quader.kuasha

গুচ্ছকবিতা
খৈয়াম কাদের 

ডানাঅলা মাছ

মৃত নগরের পথে 

এখনও হেঁটে চলে

নীল কালো হাঁস আর

মুখঢাকা মুখোশের শাদা উপহাস!


শিকেয় ঝুলোনো রাতের রোদন

খোয়াবের খুশবু ছড়িয়ে ফোটে 

সূর্যের সমুখে হাঁটে

বাজিকর বিতানের ডানাঅলা মাছ!


বাঁশতলে ব'সে কাঁদে

মাদারপীর ও গাজির গেলাপ

মৃতরা প্রলাপ বকে, নদীরা পাহাড়ে ঢোকে

ফিক ক'রে হেসে ওঠে বেগমগঞ্জের কাঁচুলি কিতাব!


বাকসের ভিতরে উত্তাপ শুয়ে থাকে

পিঁপড়েরা স্নান করে কৃষ্ণগহ্বরে

প্রাচীন জ্যোতিষী দেখে সবখানে পড়ে আছে 

মনুষ্য-ভাগ্যের আদি পরিতাপ!


বাতাসের ছায়া 


আকাশে তাকিয়ে আকাশ দেখি না,সাগরে দেখি না জল

পাহাড়ের গায়ে দেখি মরুর ধবল

তবে কি দৃষ্টির মাঠে ভ্রম ঘটে গেলো 

নাকি প্রকৃতি হারালো তার জন্মের আদল?


বন্ধুর বগলে নেকড়ের পদচ্ছাপ দেখি,

সতীর্থের কলমে দেখি অনর্থ রচনার কানাকানি;

ভেরার মাংস চিত্রা-হরিণের স্বরে ডেকে ওঠে 

মেঘ থেকে ঝরে পড়ে মন্ত্রপড়া বৈয়ামের পানি!


নিজেকে দেখি না নিজের ভেতর

দৃশ্যের বাইরে দেখি শূন্য সংখ্যার গণিত,

 জলের দর্পণে বাতাসের ছায়া ডুবে যায়

উর্বর ঊষরে ঘুমায় প্রয়াত স্বপ্নের সম্বিৎ।



শ্বেতফুল ফোটে 


রাত্রিতেও সূর্য ওঠে,জ্বলে ওঠে রৌদ্রতাপ

খরাতেও ভিজে যায় ভূমি 

জানি আমি জানো তুমি 

জানে মেঘ বৃষ্টি এবং জলের উত্তাপ! 


দৃশ্যের দর্পণে নিসর্গের জ্বর কেঁপে ওঠে 

বাতাসের পেটে ভাসে সাগরের জিন 

গোপনে সাঁতার কাটে গহীনের মীন

তপ্ত-তরঙ্গে তখন শ্বেতফুল ফোটে! 



অবাচ্য শব্দের অভিধান 


হাঁটতে নেমে দেখছি 

পায়ের সীমানা থেকে সরে যাচ্ছে পথ 

উড়ে যাচ্ছে ঘর, বাতাসে আটকে আছে প্রাপ্য সকাল

চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা

দৃশ্যগুলো হয়ে যাচ্ছে বিনয়ী মাতাল! 


কথারা ছুটছে অবাচ্য শব্দের অভিধান বুকে নিয়ে 

কানে বাজছে না কোনো শ্রাব্য ধ্বনি 

অসার বয়ানে দুলছে রক্তে রঞ্জিত স্বপ্নপাড়া

গুণিন খুঁজছে ঘুরে ঘুরে, কোথায় হারালো তার

পুরাণ খচিত সেই বসুন্ধরা!



জঙধরা ভাঁজ 


পাখিসব করে না রব, রাতও পোহায় না আর

এই জনপদে 

জীবনটা বন্দী আজো

পুঁথি-পুরাণের জঙধরা ভাঁজে! 


খুঁজতে যেও না পথে 

মীর জাফর মিরণ কিংবা জগত-শেঠ;

নাটকের দৃশ্য দেখে নাও

গানের অন্তরা শুনে নাও

পাঠ করো বাতাসে মোড়ানো মানুষের ইতিহাস 

বৃক্ষের বল্কলে সব চিত্র পাবে;

দেখবে - রাতের মিনারে সন্ধির জলছাপ ভাসে

প্রেমের ভেতরে নাচে রিপু-করা মন্ত্রের বিভাস! 



স্বরেও স্বরেআ 


সদ্যজাত শিশুর ক্রন্দনে একুশের কণ্ঠ শুনি 

এ কণ্ঠের শব্দে আমার স্বদেশ জেগে ওঠে 

এ কণ্ঠের ধ্বনিতে মুক্তির গান বেজে ওঠে 

এ কণ্ঠ জারিত করে ক খ অ আ-র শাশ্বত বাণী। 


ঢাকা থেকে শিলচর - বর্ণমালার মিছিল ধেয়ে চলে 

বাহান্নর একুশ আর একষট্টির উনিশে মে

পুরাণের স্বরে হাঁটে বদ্বীপ-বঙ্গের পথে-ঘাটে-মাঠে

হাজার নদীর পানি মায়ের বুলিতে ঢেউ তোলে।


স্বরেও স্বরেআ প ফ ম ভ

ধানপাতার শাড়িতে নাচে ত থ দ ধ

ফলা রেফ কার আর হ্রস্ব হস্

ষড়ঋতু আসে যায়,আসে যায় পালা-পার্বন বারোমাস।



কেউ তারা ক্যানিবাল নয় 


জালালি খতম হয়ে গেলে পর  

অবস রোগীটি যদি ফের নড়ে ওঠে 

ঘরের ভেতরে ঢোকে পাখির বিলাপ 

স্বজনের চোখে তখন ক্লান্তির ছায়া নেমে আসে!


ঝড় পরে প্রবল নদীর ঢেউ থেমে যায় 

আছড়ে পড়ে না জলে কাছারের মাটি 

থামে কি তখন তার গহীনের স্রোত?

থামে না, সেকথা জানে না কিন্তু পৃষ্ঠের পানি!


জঙ্গলে জন্তুর বাস, বাঘ সিংহ থেকে গুইসাপ হরিণ এবঙ  

নিরীহ পেঁচা ; কেউ কেউ মাংসাশী, তৃণভোজী কেউ

কেউ আবার খুঁটে খায় ফসলের দানা  

কেউ তারা ক্যানিবাল নয় কেবল মানুষ ছাড়া!



স্ফুরণের গীত 


নদীর সাথে নারীর দেখা হলে

রূপের অরূপে তারা বিমোহিত হয়,

রূপে রূপে করে মাখামাখি 

দ্বিত্বের দ্বৈরথ ভেঙে অস্তির একত্বে মিশে যায়!


জলের চিতায় জ্বলে সৃষ্টি-তাড়নার দ্যুতি

দৃশ্যের আবিরে সব দৃশ্যাতীত হয়ে যায়;

সেই তাপে স্নান করে নিমগ্ন হৃদয় 

মনে হয় সিজদায় পড়েছে নুইয়ে আনাল হকের ভঙিমায়!


প্রত্নকালের এই প্রবীন জল 

বীজের উদরে ঢালে স্ফুরণের গীত, 

শারদীয় শিশিরের প্রেম লুফে নেয়

রোদের চুম্বনে আঁকে ভাবের সম্বিত!  


নদীর ভেতরে নারী, নারীর ভেতরে নদী খেলা করে

নারী-নদী মকরন্দ-সুধা, জলের আকাশে ওড়ে!



দাসত্ব আরাধ্য হলে 


বাতাস স্তম্ভিত, মেঘও দাঁড়িয়ে গেছে মধ্য ব্যোমে

দেখছে বদ্বীপ; দেখছে দৃশ্য এবঙ অদৃশ্য প্রদীপ!

দাসত্ব আরাধ্য হলে দেবতাও ব্যর্থহয়

দূর-শিখনের বাচাল তখন প্রণয়ের গান গায়!

 

দেশবোধ জাতিবোধ সংজ্ঞা পায়নি আজও

গুজবের স্রোতে ভাসে সত্যের মা-ও!

লুকোনো সুতোর টানে শরীর দুলিয়ে নাচে নীরব পুতুল 

মৃত্তিকা হারিয়ে ফেলে বগলে আগলে রাখা একূল-ওকূল!


মায়ের স্বপ্নটা, বাবার যুদ্ধটা, দিক ভুলে ডুবে যায় অন্ধকারে 

মগেরাই ফিরে আসে, ফিরে আসে ক্লাইভের বংশ বারেবারে!



পলিটিক্স


গণিকা সত্যের পলিটিক্স গিলে 

আমাদের নেতারা পবিত্র হন

তাদের বায়াতে শিখি

নিজেকে ভিখিরি করার মুর্শিদি গান।


তাদের পবিত্র নামে

মিছিল করি, শ্লোগান দেই

ভুলে যাই ঘরের খবর

তাদের পকেটে রাখি আত্ম-সনদের খেই।


ওনারা রুহানি ছবকের ওলি

জীবনের সব গলি চেনেন, মানুষকে বানান মুরিদ 

মানুষকে হরণ করেন, ভাঙেন গড়েন 

মানুষকে নিঃস্ব করে মানুষেরই হয়ে যান সুহৃদ! 


মাহবুবা করিমের কবিতার পড়ুন এখানে
খসরু পারভেজের কবিতা পড়ুন এখানে
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে
বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা পড়ুন এখানে
নাগিব মাহফুজ এর উপন্যাস ভিখারি পড়ুন এখানে
কবি আমিনুল ইসলামের দারুণ কবিতা পড়ুন এখানে

কষ্টের সিম্ফনি

 

স্মৃতি নীল হলে নিজেকে অমর মনে হয়,

মনে হয় ইতিহাস যেন এক কবরের মমি;

ভোলা তো যায় না কিছু, বারবার সব মনে পড়ে 

স্মৃতির মিনারে ওড়ে বিস্মৃত কালের ঘুড়ি! 


বদলের স্বপ্ন শেষে আগের দৃশ্যই ফিরে আসে, 

কৌমের ভূমিতে ঝরে বিবিধ বৃষ্টির পানি;

বাবার পীড়িত মুখ রঙের ফানুসে নড়েচড়ে, 

মায়ের হেঁসেলে পোড়ে কষ্টের সিম্ফনি! 


পাখিনগরের যত গান, যত সরোদের সুর

বেজে বেজে সরে যায়, সরে যায় দূর-বহুদূর।


2 মন্তব্যসমূহ

Thanks

  1. প্রথমে ভুল ধরি। “ ভেরার মাংস “ কি? “ ভেরা” বলে কোনো প্রাণী নাই। হবে “ ভেড়া”। “ জগত-শেঠ” বানানটা হবে “ জগৎশেঠ”। “অবস “ বানানটি হবে “ অবশ” । “প্রবীন” বানানটি হবে “ প্রবীণ” । “ পার্বন” বানানটি হবে “পার্বণ” । “কাছার” বানানটি হবে “ কাছাড়”। এখন কবিতায় আসি। “ বন্ধুর বগলে নেকড়ের পদচ্ছাপ দেখি “, “ ধানপাতার শাড়িতে নাচে ত থ দ ধ“, “জলের চিতায় জ্বলে সৃষ্টি-তাড়নার দ্যুত “, “ দূর-শিখনের বাচাল তখন প্রণয়ের গান গায় “, “ মৃত্তিকা হারিয়ে ফেলে বগলে আগলে রাখা একূল-ওকূল!”, “ গুজবের স্রোতে ভাসে সত্যের মা-ও “, “স্মৃতির মিনারে ওড়ে বিস্মৃত কালের ঘুড়ি! ”, “ হাজার নদীর পানি মায়ের বুলিতে ঢেউ তোলে ।”, “ অসার বয়ানে দুলছে রক্তে রঞ্জিত স্বপ্নপাড়া “, “ বাতাসে আটকে আছে প্রাপ্য সকাল”, “ চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা / দৃশ্যগুলো হয়ে যাচ্ছে বিনয়ী মাতাল! “--- এধরনরে উৎকৃষ্ট মানের ও অভিনব প্রকৃতির চিত্রকল্প যার হাতে রচিত হয় তিনি একজন প্রকৃত কবি। তার কবিতায় শুরুতে চিহ্নিত “ বানান বিভ্রাট “ মেনে নেয়া যায় না।

    উত্তরমুছুন
  2. কবিতার পড়ার আনন্দ পেলাম! বানান বিষয়ে সচেতনতা আবশ্যক মসন করি।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks

নবীনতর পূর্বতন