মুরাদ ক্বালবি-র গুচ্ছ কবিতা
কোলাহল
কোলাহল শূন্যের উদরে বেড়ে ওঠা বিমূর্ত উপাদান।
নিরবতার গহ্বরে জন্ম নেয়া ভ্রুণ।
শসিন্দা ক্ষেত যখন ঘুমিয়ে পড়ে,
টিক টিক দেয়াল ঘড়ি,
কর্তব্যপালনে অবিচল,
ঘুমো পৃথিবী হাইতুলে বিছানা ছাড়ে।
এভাবেই অহর্নিশ সজাগ থাকে জৈব নশ্বর ধরনি।
নিরবতার বিপরীতে দাঁড়ায় মন,
কোলাহল নিঃশ্বব্দ পৃথিবীর হৃদস্পন্দন।
খোলস
সবুজ আখের শক্ত খোলস,
সটান মাথায় দাঁড়িয়ে,
রোদ্দুরের সাথে মিতালিতে মেতে ওঠে
যখনই বর্ষা নামে,
অব্যক্ত প্রেম ঠোঁটে ঝরায়,
বক্রচাঁদের সুমিষ্ট চুম্বন।
গ্রীষ্মে রোদেপুড়ে অঙ্গার হয়,
বর্ষায় বুকে জমিয়ে রাখা
রস উজাড় করবে বলে।
চেখে নিতে কোমল হৃদয়,
খোলস দেখে করোনা ভয়।
অবশিষ্ট
মাছের পিঠ ছেঁচে
পয়সা ছড়ানো হলো।
ময়নাতদন্তের ভঙ্গিতে বের করা হলো ডিম।ভবিষ্যতের স্বপ্নরা সেখানেই আত্মগোপন করে ছিলো।
যেই হৃদয়ে ছুরি বসানো হলো,
অমনি শূন্যতার বুকে ভেসে আসে হাহাকার।
স্বপ্ন চুরমার করেছো,
হৃদয় ভেঙ্গোনা অন্তত,
ওটাই পৃথিবীর অবশিষ্ট আছে।
ছাতা
দরজারপাশে ঝুলে থাকতো লাল নীল দুটি ছাতা,
লাগবে কখন জাগবে তারা কানটা তাদের পাতা।
একদিন খুব দুপুর বেলা বৃষ্টি হবে ভেবে,
রোদের মধ্যেই হাঁটলো ছাতা বৃষ্টি মাথায় নেবে।
ক্ষণিকপর হাত ফসকে পড়লো কোথায় সে,
সম্বিত ফিরে আসল এবার খুঁজবে তারে কে।
সব জায়গাতে হন্য হয়ে খোঁজা হলো আমার,
ছাতামিস্ত্রি বল্ল: আপনার না, এটা ঐ মামার।
নীল ছাতাটা সঙ্গিবিহীন লাল ছাতার নাই দেখা,
বিশ্বজুড়ে কেউ কারো নয় সময় হলেই একা!
ফাঁক
দশ টাকার এক প্যাকেটে কয়খানা আর চিপস,
পেট ফুলিয়ে নজর কাড়ে বাতাসটাই তার টিপস।
আজব সমাজ বাতাস বেচে প্যাকেটে ভরে,
বিনা পয়সায় কত্তো বাতাস খাও তুমি ঘুরে।
জীবনটা নয় কাঁচের দেয়াল নয়তো ফাঁকা বুলি,
আসল রঙটা দেখ একবার নকল চশমা খুলি।
হাওয়াই মিঠাই
লাঠির মাথায় ফাঁপানো হাওয়াই মিঠাইর বেলুন,
লোভ সামলানো কঠিন ব্যাপার খেতে এবার চলুন।
একটা মিঠাই বড়া আশায় হাত বাড়িয়ে ধরি,
হাতের চাপে ক্ষণিক পরেই হয়ে গেল বড়ি!
কান্ড কী ভাই! এত্তোবড়ো বেলুন কোথায় গেল,
রঙ মেশানো চিনির ভেতর বাতাস বলে হ্যালো।
জগৎ সংসার হাওয়াই মিঠাই মিছে পিছু ধাও,
দম ফুরানোর আগেই তুমি বারেক ফিরে চাও।
পোস্টার
দিনদুপুরে ফুটপাতেতে যাচ্ছি যখন হেঁটে,
হরেকরকম বিজ্ঞাপনের পোস্টার আছে সেঁটে।
পড়াইতে চাই,বিদেশ পাঠাই,অর্শ্বভগন্দর;
তাবিজ দাওয়াই, বুয়া সাপ্লাই, চমকপ্রদ খবর।
রাস্তার ধারে বসছে যেন জীবনের মেলা,
মনগলানো, চোখ ভোলানো, ফড়িয়াদের খেলা।
হাঁটছি আমি, হাঁটছে জীবন, পোস্টার সাথে আছে,
জীবনযুদ্ধ মানুষ রুদ্ধ মানুষেরই কাছে।
আশা
ভেবেছিলে বৃষ্টি হবে ছাতা হাতে তাই,
নীলশাড়ি অঙ্গে শোভা, বৃষ্টি কিন্তু নাই।
ভেবেছিলে বৃষ্টি ভিজে ভেজা শাড়ি পরে,
শহরময় ঘুরে বেড়াবে দস্যিপনা করে।
তোমার সেই ভাবনায় পড়লো যেন বাজ,
বেরসিক বর্ষা কেন
ঝরলোনা যে আজ।
আমি তখন ভাবতেছিলাম করবো কি আর তাই,
বললে তুমি মনের বর্ষায় হবে আজকে ঠাঁই।
শূন্য থেকে পূর্ণ হতে শিখলাম তোমার কাছে,
বিন্দু থেকে বৃত্ত হবো মরবোনা আর লাজে।
বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ ফুটবলের বসছে যখন আসর,
মারণাস্ত্রের আঘাতে ভাঙছে কারো বাসর।
সবুজঘাসে ছুটছে বল এই পা-ওই পা হয়ে,
গাজাবাসির মুখের হাসি যাচ্ছে তখন ক্ষয়ে।
দর্শকভর্তি গ্যালারিতে হর্ষধ্বনি ওঠে,
রিফুজিদের পাতে তখন খাবার নাহি জোটে।
একদিকে হাসছে বিশ্ব আনন্দের জোয়ার,
আরেকদিকে বন্ধ হচ্ছে মানবতার দুয়ার।
শান্তি যদি নাইবা আসে অস্ত্র-বারুদ ত্রাসে,
বিশ্বকাপের মেডেলটা দাঁত কেলাইয়া হাসে।
কবিতা-১০
রেমিটেন্সযোদ্ধা
:মুরাদ ক্বালবি
লাগেজভর্তি স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গেছে যারা,
দিনরাত্রি খাটনি খেটে স্বপ্ন বোনে তারা।
মাটি থেকে টেনে তোলে আকাশ ছোঁয়া ভবন,
মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে মরুর গরম পবন।
ঋণের বোঝা শুধতে গিয়ে কাটে অর্ধদশক,
জিম্মি করে চিমটি কাটে মানবপাচারি শোষক।
গ্রামের বাড়িতে স্বপ্ন আসে, আসে রেমিটেন্স,
সেই টাকাতেই হই আমরা লেডিস এন্ড জেন্টস।
কবিতা-১১
আষাঢ়
:মুরাদ ক্বালবি
আষাঢ় এলো আষাঢ় এলো কদম কোথা ফোটে,
একচিলতে মেঘেই কি বৃষ্টির কপাল জোটে।
নীলশাড়ি আর নীল পাঞ্জাবি খোঁপায় কদম কই,
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হবে আমি তাকিয়ে রই।
সূর্যিমামা তাপ ছাড়িয়ে মেজাজটা বিকোয়,
বরষদিনে সরস বৃষ্টি উঠলো যেন শিকোয়।
রোদের গায়ে মেঘের উঁকি আমি তাাকয়ে থাকি,
একটু পরে বাতাস ছুটে বৃষ্টি নামবে নাকি।
মেঘ উঠুক বা রোদ্দুর উঠুক তাতে আমার কি,
মনের মাঝে বর্ষাকালের ছবি এঁকেছি।
আক্ষেপ
দুর রাতের কোন বাড়িতে বাজছে শুধু ঢোল,
ঘুম আসেনা ঘুম আসেনা দরজা একটু খোল।
পূর্ণিমাতে গেঁয়ো পথে হাঁটছি অবিরাম,
ঢোলের বাড়ি আড়াআড়ি মাতালো যে গ্রাম।
যেতে যেতে পেলাম সেথা বাজছে যেথা ঢোল,
সামনে গিয়ে বসে দেখি ফুরিয়ে গেছে বোল।
দূরেই ছিলাম ভালো ছিলাম শ্রুতি সুমধুর,
কাছে আসলে অনেককিছুর থাকেনা আর সুর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks