সকাল বেলার পাখি
খুব ভোরে আযানের আগেই উঠতে হয় রাবুকে, তারাতারি উঠে কোনোরকমে নামাজটা শেষ করে ছোটে বেকারিতে। দেরি হলে অনেক সময় ভাগে পায় না। এখনকার ছেলেমেয়েগুলো অনেক চালাক, আগে আগে গিয়ে বড় সাইজের গরম গরম বনরুটিগুলো বেছে নিয়ে যায়। দেরি হলে ভাগে মেলে ছোট আর গতকালের বাসি রুটি। একদিন বাসি রুটি দেখলে পরের দিন আর কেউ রাবুর কাছথেকে রুটি কিনতে চায়না। কিন্তু যেভাই হোক প্রতিদিন তাকে ৫০টা রুটি বেঁচতেই হবে, তা না হলে তার দিনের খাবার জোগাড় হবেনা একটা রুটিতে থাকে মাত্র এক টাকা। আর পঞ্চাশ টাকা জোগাড় করতে পারলে কোনোমতে ভর্তা ভাজি দিয়ে দু’বেলা দুই মুঠো ভাতের জোগাড় হয়। আর যেদিন সবগুলো রুটি বিক্রি হয়না সেদিন গায়ে পড়ে, কেউ কেউ বাকি নিয়ে সপ্তার পর সপ্তা ঘুরায়। লাভ তো দূরের কথা আসলই ওঠে না। যেদিন লস হয় সেদিন রাবু চিড়া ভিজিয়ে লবন দিয়ে খায় তবু ভিক্ষা করেনা, ছেলে মেয়ে কারো কাছে হাত পাতেনা। কেন পাতবে? যাদের ঘরে বৌ বাচ্চা সবার জন্য খাবারের জোগাড় হয় শুধু সে একা খেলে হাড়িতে টান পড়ে সেই ঘরে সে কেন যাবে? রাবুর স্বামীর অবস্থাও তেমেন ভালো কিছু ছিলনা, রিক্সা চালিয়ে যা আনত ছেলে মেয়েদের খাইয়ে তারপর রাবু মুখে খাবার তুলছে, যেদিন কামাই হতনা সেদিন ছেলে মেয়েকে খাইয়ে নিজে না খেয়ে থেকেছে। আর আজ সেই ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে! রাবু আর ভাবতে চায় না। থাকুক যার মত সে, আমি যে কয়দিন আছি নিজের কামাই নিজেই করে খাব। কেন আল্লাহ কী আমারে হাত পাও দেয় নাই? নিজেই নিজেকে বলে। কিন্তু আজ সেই হাত, পা’ই তার সাথে বেইমানি করে বসেছে। কাল আইসক্রীমওয়ালার ঘরে বাকির টাকা আনতে যাওয়ার সময় আছাড় খেয়েছিল রাবু, তখন সামলে নিলেও এখন আর কমর সোজা করে উঠতে পারছে না। আইসক্রীমওয়ালার ঘরে পাঁচটা ছেলে মেয়ে ওরা প্রায়দিনই সকালে রাবুর কাছথেকে রুটি নেয়, দেখা গেলো কোনো দিন তিনটার দাম দেয় আবার কোনোদিন চারটার, প্রতিদিন একটা দুটোর দাম বাকি ফেলে রাখবেই। নিরক্ষর রাবুর পক্ষে অনেক সময় হিসাব ঠিক রাখতেও অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তবু কিছু করার নেই। কাস্টমার হল লক্ষী এদের কখনো অবহেলা করতে হয়না। এই নিয়ে চল্লিশ টাকা বাকি হয়েছে ওদের কাছে, সেই টাকা আনতে গিয়ে টাকা তো পেলই না। উল্টে আছাড় খেয়ে এখন আর বিছানা থেকে নড়তে পরছেনা।
কিন্তু আজ রাবুর বের হওয়াটা খুব জরুরি, কারন আজ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন, এই দিনে বড় মাঠে মেলা বসে, কত কত ছেলে মেয়ে আসে সেখানে। রাবু অপেক্ষা করে এই দিনটার জন্য, ছোট বেলায়ও অপেক্ষা করত সে, কারন তখন সে নাগোর দোলায় চড়ত, বাবার কাছ থেকে কদমা বাতাশা কিনে নিত, কখনো বা পেত প্লাস্টিকের লাল চুড়ি, বেলবেটের ফিতা, আর মাটির তৈরি হাতি ঘোড়া।
সেই দিনগুলো এখন আর নেই, এখন রাবু অপেক্ষা করে পহেলা বৈশাখ আসলে দুই কেজি আটা কিনে তাতে একটু স্যাকারিন আর সোডা মিসিয়ে তেলে ভাজলে মোয়ার মত বড় বড় গোল গোল পিঠার মত হয়, তুলার মত নরম হয় সেই পিঠা। রাবু তার নাম রেখেছে “গোলগোল্লা” মেলার সামনে বসলে বাচ্চারা সেই গোলগোল্লা কিনে খায়। সেদিন ২০০ টাকার উপরে লাভ হয় রাবুর। পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন জায়গায় পান্তা ভাতের সাথে ভাজা ইলিশ বিক্রি করা হয়। রাবু গোলগোল্লা বিক্রির পর লাভের টাকাটা হাতে নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খুঁজতে থাকে কাদের বিক্রি প্রায় শেষ পর্যায়ে…! কারন শেষের দিকে মাছের কাঁটা লেজ এসব পড়ে থাকে হাঁড়ির তলানিতে। সেগুলো বড়লোকেরা কিনে খেতে চায় না। রাবু তখন কম দামে একটা ইলিশের লেজ আর এক প্লেট ভাত কিনে সাথে শুকনা মরিচ ডলে খায়। কী যে স্বাদ তাতে! সারা বছর রাবু অপেক্ষা করে ঐ পহেলা বৈশাখের জন্য। কারন প্রতিদিন তার যে ইনকাম তাতে এক পোয়া চিংড়িও কেনা চলেনা, আর ইলিশ মাছ তো স্বপ্নের ব্যপার। তার ছেলে মেয়েরা কিনে খায় কিন্তু মায়ের কথা তারা ভুলেও মনে করেনা। স্বামী মরার পর আর কখনো ইলিশ মাছ কিনে খেতে পারেনি সে, কিন্তু ইলিশের স্বাদ এমন যে বহু বছর তা মুখে লেগে থাকে। চোখ বন্ধ করলে রাবু এখনো দেখতে পায় জয়নাল মিয়া সারাদিন রিক্সা চালিয়ে রাতে বাড়ি ফেরার সময় ঝাটকা ইলিশ দঁড়িতে বেঁধে হাতে ঝুলাতে ঝুলাতে বাড়ি ফিরছে, চাঁন্দের আলোতে সেই ইলিশ কেমন ঝিলিক দিয়ে উঠত। তখন একই ঝিলিক খেলা করত রাবুর পরিবারের সকলের চোখের তারায়। রুপার চুড়ি হাতে পড়ে রাবু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাঁটত রুপালী রঙের ইলিশ, সেই রাতেই ভেজে একে এতে তুলে দিত সবার পাতে। সারাদিন না খাওয়া পেটে সেই ইলিশের স্বাদ আজও ভোলার নয়। দু’চার টুকরো যা থেকে যেত সকালে পান্তাভাতের সাথে মরিচ ডলে ভাগাভাগি করে খেয়ে নিত সবাই মিলে। কতই না সুখের ছিল সেই দিনগুলো। একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে নিজের অজান্তে।
রাবু আরো একটু পিছনে ফিরে তাকায়, তার বাবা ছিল জেলে। মহাজনের নৌকায় সাগরে যেত মাছ ধরতে, যখন বাড়ি ফিরত হাতে থাকত এক হাত লম্বা পেটে ডিম ভর্তি চওড়া চকচকে ইলিশ। মা সেই ডিম পিঁয়াজ মরিচ দিয়ে আলাদা ভাজি করে দিত, আহা সেই স্বাদ আজও চোখ বুজলে জিভের আগায় টের পায় রাবু। বাবা মরার পর আর কখনো অত বড় ইলিশ খায়নি সে, কত বছর হবে? তাও তো মনে পড়েনা। স্বামীর ঘরে অত বড় না হলেও সে ইলিশ খেয়েছে প্রায়ই,
জয়নাল বলত- না খাইলে কামাই হরি ক্যা? ভালো ভালো খাইলে কইলজাডা বড় হয়।
তখন রাবু জয়নালের কথা বুঝতনা এখন বোঝে, সত্যিই তার কলিজাটা শুকিয়ে আজ অনেক ছোট হয়ে গেছে। কতদিন হল সে মাছ খায় না! কোরবানির ঈদ ছাড়া মাংশ খেতে পায় না। এইভাবে বেঁচে থেকে লাভ কী? হঠাৎ ঘরের পাশে কয়েকটা কুকুরের বিকট চিৎকারে সম্বিৎ ফেরে তার, বেঁড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে কিছু একটা মরা নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে দুটো কুকুর। রাবু বলে আলহামদুলিল্লাহ! সে নিজেকে বোঝায় ওদের চেয়ে অনেক ভালো আছো তুমি।
আড়মোড়া ভেঙ্গে ওঠার চেষ্টা করে রাবু, কিন্তু না, পারেনা। শরীরটা আজ পাথরের মত ভারি মনে হচ্ছে, আবার চেষ্টা করে সে…
না এবারও পারে না। সকালবেলার পাখিটা আজ আর তার নীড় ছেড়ে উড়তে পারে না, সে আবার এলিয়ে পড়ে নিজের বিছানায়। দুর্বলতায় চোখের পাতা দুটো আবার বন্ধ হয়ে আসে, রাবুর চোখের সামনে ভাসতে থাকে শহরের মোরে মোরে হাড়ি ভর্তি পান্তাভাত আর বড় বড় চাকা করা ইলিশ ভাজি, যা অনেকদিন খায়নি সে…………………….।।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks