প্রবন্ধ।। "পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়" বাঙালীর আত্মত্যাগ ও রক্ত বির্সজনের ফল।। aricle by ilius mahmud কুয়াশা

 

"পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়"
বাঙালীর আত্মত্যাগ ও 
রক্ত বির্সজনের ফল

|| ইলিয়াস মাহমুদ

‘কাব্যনাট্য বা কাব্যনাটক হলো এমন এক ধরণের নাটক যা পদ্য বা ছন্দে রচিত এবং যেখানে কবিতার নান্দনিকতা ও নাটকের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সংমিশ্রণ ঘটে। এটি মূলত কাব্যিক সংলাপের মাধ্যমে মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য লেখা হয়, যেখানে আবেগ, রূপক এবং কাব্যময় ভাষা চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করে।  গদ্যের পরিবর্তে পদ্য বা ছন্দে সংলাপ রচিত হয়। এতে কবিতার লিরিক্যাল বা গীতিধর্মিতা এবং নাটকের দৃশ্যপট ও দ্বন্দ্ব—উভয়ই বিদ্যমান থাকে। অনেক ক্ষেত্রে রূপক বা প্রতীকী ভাষার ব্যবহার দেখা যায়, যা আধুনিক কাব্যনাট্যে বেশি স্পষ্ট।  সংলাপগুলো অত্যন্ত আবেগপূর্ণ  ও উচ্চমার্গীয় হয়। তবে কাব্যনাটকের আঙ্গিকের ক্ষেত্রে কিছুটা নির্দিষ্টতা দেখা যায়। নাট্যক্রিয়া-কাব্যবোধ-কাব্যালংকার-ছন্দ ইত্যাদি থাকতেই হবে। শুধু কাব্যবোধ প্রকাশিত হলেই কাব্যনাটক বলা যাবে না – তৎসঙ্গে নাট্যক্রিয়ার সংমিশ্রণ ঘটাতেই হবে। তাহলেই তা কাব্যনাটক পদবাচ্য হয়ে উঠবে, নচেৎ নয়। কাব্যনাট্য আধুনিক সময়ের সৃষ্টি, একটি আধুনিক ফর্ম ; ইউরোপীয় সাহিত্যে টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) এর প্রবক্তা। এ প্রসঙ্গে মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল (১৯৩৫) লেখার দুবছর পূর্বে ১৯৩২-৩৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় এলিয়ট বলেছিলেন, ‘The ideal medium for poetry, to my mind, and the most direct means of social usefulness for poetry, is the theatre … For the simplest auditors there is the plot, for the more literary the words and phrasing, for the more musically sensitive the rhythm, and for auditors of greater sensitiveness and understanding a meaning which reveals itself gradually…’
 এটি একটি সফল কাব্যনাট্য কারণ এতে পদ্য বা ছন্দময় ভাষা ব্যবহৃত হলেও তা নাটকের স্বাভাবিক গতিরোধ করে না। সাধারণ সংলাপের স্থানে ব্যবহৃত কবিতার পঙক্তিগুলো গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, ভীতি এবং আসন্ন মুক্তির আনন্দকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। কবি এখানে সংলাপের মাঝেও কাব্যের নান্দনিকতা বজায় রেখেছেন।
যেমন: "পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! মাঠের পরে মাঠ, মাঠের পরে মাঠ, মানুষ আসছে!"
নাটকটিতে অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মিশ্রণ এবং দীর্ঘ সংলাপের বদলে ছোট ছোট পঙক্তির ব্যবহার চরিত্রগুলোর ভেতরের উত্তেজনা ও ভয়ের পরিবেশকে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেয়। চরণের ছন্দগুলো কখনো দ্রুত , কখনো ধীর  হয়ে নাটকের আবহ তৈরি করে। ঐতিহ্যবাহী কাব্যনাট্যের ধারায় গ্রিক নাটকের মতো এই নাটকে ‘গ্রামবাসী’ বা কোরাসের ব্যবহার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। গ্রামবাসীর সমবেত সংলাপ এবং তাদের কণ্ঠস্বর নাটকে এক ধরণের গ্রিক ট্রাজেডির আমেজ নিয়ে আসে, যা সামষ্টিক মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও বিপন্নতাকে তুলে ধরে।

নাটকটি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রের কাহিনী না বলে একটি গ্রাম ও তার সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব ভয়, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, বিশ্বাসের জায়গা দেখিয়েছে। পীর, মাতবর এবং সাধারণ গ্রামবাসীর কথোপকথনে ফুটে উঠেছে সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের ইঙ্গিত।

সার্থক কাব্যনাট্যের লক্ষণ হলো—এটি পড়া এবং অভিনয় (মঞ্চায়ন) দুভাবেই সমান উপভোগ্য। 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়'-এর সংলাপগুলো গীতল, কিন্তু তা নাট্যমঞ্চের উপযোগী। আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশনায় এর মঞ্চসফলতা প্রমাণ করে যে, কাব্যিক ভাষা এখানে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি, বরং নাটকীয়তা বাড়িয়েছে।

সৈয়দ হক দেখিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা কেবল গদ্যে বর্ণনার চেয়ে কাব্যের ভাষায় বেশি হৃদয়গ্রাহী ও প্রতীকী হয়ে ওঠে। এই নাটক কাব্য ও নাটকের শর্ত পূর্ণ করে এক অপূর্ব শিল্পমাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' কাব্যনাট্যে সৈয়দ শামসুল হক বাংলা কবিতার ছন্দকে নাটকের পাত্রে ঢেলে যে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, তাতে তিনি পুরোপুরি সফল। এটি শুধু মুক্তিযুদ্ধের দলিল নয়, কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে একটি সার্থক শিল্পকর্ম।  নাটকটি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রের কাহিনী না বলে একটি গ্রাম ও তার সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব ভয়, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, বিশ্বাসের জায়গা দেখিয়েছে। পীর, মাতবর এবং সাধারণ গ্রামবাসীর কথোপকথনে ফুটে উঠেছে সামাজিক বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের ইঙ্গিত।

 

'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' নাটকের প্রেক্ষাপট 'মুক্তিযুদ্ধ'।'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। এটি তার মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা সবচেয়ে সার্থক মঞ্চ সফল নাটক। লেখক এইটি কাব্যনাট্য আঙ্গিকে লিখেছেন। উত্তর বাংলার আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার রয়েছে এ নাটকে। গতিশীল ভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যুদ্ধকালীন বাস্তবতার কুশলী প্রয়োগ ঘটেছে এ নাটকে। যুদ্ধশেষে মুক্তিবাহিনীর গ্রামে প্রবেশ এর সময়কার ঘটনা এখানে সংলাপ ব্যবহারের কুশলতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। এ কাব্যনাট্যে বাঙালির দেশপ্রেম, দেশের শত্রুর প্রতি প্রবল ঘৃণা এবং আক্রোশের সাথে বাঙ্গালির সাংস্কৃতিক জীবনের চিত্র রূপায়িত হয়েছে
সৈয়দ হকের কাব্যনাট্যের মূল অভিপ্রায়, ভাব ও রস । তার বহুল পরিচিত কাব্যনাট্যের অন্যতম ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। এই নাটকের মূল অবলম্বন মুক্তিযুদ্ধ। মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অতি পরিচিত গল্পকে অবলম্বন করা হয়েছে। এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোটাগনিস্ট চট করে আবিষ্কার করা না গেলেও এন্টাগনিস্ট হিসেবে এসেছে পীর, মাতবর, পাইক। কাহিনির মধ্যে এসেছে—ধর্মের সহযোগিতায় কীভাবে মাতবর শ্রেণি পরিপুষ্টি লাভ করে, এ ছাড়া হানাদারের দোসর মাতবর কীভাবে নিজের কন্যাকে পাক-সেনার হাতে তুলে দেয়। পরিশেষে, মাতবরের মেয়ে লজ্জায় ক্ষোভে বিষপানে প্রাণত্যাগ করেন। বলতেই হয়, কাহিনি হিসেবে এটি অতি সাদামাটা অর্থাৎ লেখকের ইমাজিনেশন এখানে কাজ করেনি।  এই ইমাজিনেশনকে কাজে না লাগানোই এখানে নাট্যকারের ইমাজিনেশন। কারণ, লেখকের মূল প্রতিপাদ্য ছিল সমস্ত ঘটনাকে গ্রামবাসীর মধ্য দিয়ে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ, লেখক এখানে মুক্তিযুদ্ধের এই অতিপরিচিত কাহিনিকে সাধারণ মানুষের মধ্য দিয়ে সংগঠিত করতে চেয়েছেন। সুতরাং এই নাটকের নায়ক একক কোনো ব্যক্তি নন, ৬৮ হাজার গ্রামবাসীই তার প্রকাশ।বাংলাদেশের সাহিত্যে তিনি সব্যসাচী লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও তাঁর কাব্যনাট্য সংগ্রহ তাঁকে অন্যমাত্রায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল – সফল আঙ্গিক নিরীক্ষা এবং ব্যক্তি-বাস্তবতার ইঙ্গিতকে আধুনিক সমুন্নতিতে প্রকাশের গুণে।
সৈয়দ শামসুল হক ‘নাটকের করণকৌশল’ লেখায় বলেছেন, দেশ থেকে বহুদূরে বসে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ লিখেছিলাম। এক কামরার ছোট একটি ঘরে, শীতার্ত লন্ডন নগরীতে। সে বছর ১৯৭৫ সাল। আমি ভোরে উঠে কাজে বেরোই ছাইরঙা মোটা ট্রেঞ্চকোট পরে, পাতাল রেলের ইস্টিশানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি ট্রেনের। লন্ডনের ইস্টিশানের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মনে মনে রচনা করে চলি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’।
এই নাটকের বীজ মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব একটি ঘটনা থেকে পেয়েছেন উল্লেখ করে সৈয়দ হক বলেন, “এমন ঘটনা বাংলাদেশে সেদিন প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই ঘটেছিল বলে আমরা দেখতে পাবো। আমরা দেখতে পাবো যে, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যারা সহায়তা করেছিল তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত ঐ হানাদার বাহিনীরই শিকারে পরিণত হয়েছিল।”
নাট্যজন রামেন্দু মজমুদার মনে করেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের যত নাটক হয়েছে তার মধ্যে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ অন্যতম প্রধান।
“এই নাটকে রাজাকারকে বড় করে দেখানো হয়েছে বলে কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্যও করেন, তবে তা ঠিক নয়। মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের যে পতন হয়েছে, তা দেখানো হয়েছে। সৈয়দ হক নাটকটি রচনা করেছেন কাব্যে। আমাদের এক সময় একটা ধারণা ছিল, যে কাব্যনাট্য মানে কেবলই কবিতা। এটা নাটক হয়ে ওঠে না। কিন্তু কাব্যনাট্য যদি যথার্থভাবে রচিত হয়, তবে কাব্যনাট্যও মানুষের মনে ভীষণ অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে। তার একটি উজ্জ্বল উদাহারণ ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। এই নাটকটি আমাদের দেশে কাব্যনাট্যের একটা বড় ভিত রচনা করেছে।”
একজন পিতা যখন নিরুপায় হয়ে বিবাহ নামক প্রহসনের দোহাই দিয়ে স্বীয় কন্যাকে মিলিটারি বাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়, তখন সহজেই অনুমান করা যায় ১৯৭১-এ বাংলাদেশের আপামর জনগণের করুণ অবস্থা। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে প্রকাশ্য চরিত্র চারটি – মাতবর, মাতবরের মেয়ে, পীরসাহেব ও পাইক। – আর বৃন্দচরিত্র – গ্রামবাসী। এছাড়া নেপথ্যচরিত্র হিসেবে আরও কিছু চরিত্রের নাম ও তাদের ভূমিকা প্রকাশ্য চরিত্রগুলোর মুখে উচ্চারিত হয়েছে। যেমন শেষদৃশ্যে আগত মুক্তিযোদ্ধারা, পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন, – মাতবরের স্ত্রী, মাতবরের মেয়ের হবুস্বামী, মুক্তিযোদ্ধা স্কুলমাস্টার প্রমুখ চরিত্র।
কাব্যনাট্যের সূচনাকাল মুক্তিযুদ্ধ। সৈয়দ শামসুল হক দেখিয়েছেন, কালীপুর, হাজীগঞ্জ কিংবা ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী থেকে মানুষ আসছে। দলে দলে যমুনার বানের মতো মানুষ আসছে। কাব্যনাটকে তুলে ধরেছেন,  “মানুষ আসতে আছে কালীপুর হাজীগঞ্জ থিকা/ মানুষ আসতে আছে ফুলবাড়ী নাগেশ্বরী থিকা/ মানুষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান/ মানুষ আসতে আছে মহররমে ধূলার সমান... মানুষ আসতে আছে বাচ্চাকাচ্চা-বৌ-বিধবা বইন/ মানুষ আসতে আছে আচনক বড় বেচইন”। নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছে। আসেন একজন পীর সাহেবও। আর তারা সবাই জড়ো হয় গ্রামের মাতবরের বাড়িতে। মাতবরের কাছেই তাদের সব প্রশ্ন! তাইতো উৎকণ্ঠিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে সবাই মাতবরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এই মাতবরই হচ্ছেন নাটকের প্রধান তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি মূলত পাকিস্তানের সহযোগী, দালাল অর্থাৎ রাজাকার।  পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের প্রধান চরিত্র এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মাতবর। তার মধ্যেই মূর্ত হয়ে উঠেছে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকশক্তি : রাজাকার আলবদর ও শান্তিবাহিনী। নাট্যকার গ্রামবাসীর মুখের সংলাপে সমাজের এই ঘৃণ্য চরিত্র সম্পর্কে নিম্নরূপ ধারণা দিয়েছেন :
মানুষের বেশে
এরচেয়ে বড় কোনো দাঁতাল আপনারা
গহীন জঙ্গলে গিয়া ঘেরা দিয়া, পিটাইয়া ঢেড়া
পাইবেন না, মুশকিল আছে।
আমাদের সুখ শান্তি আশা
নিজের স্বার্থের লোভে জলে দিছে ভাসা
এই সেই লোকটা যতক্ষণ জীবিত সে আছে
নাই আমাদের নিজের জীবন।
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের মাতবর একটি খল চরিত্র হলেও নাট্যকার আশ্চর্য কুশলতায় তাকে অপেক্ষাকৃত সংবেদনশীল করে নির্মাণ করেছেন। যে কারণে নাটকে মাতবরের রাজাকার ভূমিকার তুলনায় ধর্ষিত-মেয়ের অসহায় পিতা-রূপ অধিক মূর্ত হয়ে উঠেছে। নাটকের শুরুতে মাতবর চরিত্রটিকে বলিষ্ঠ, দাম্ভিক ও খল মনে হলেও মাতবরের মেয়ের মঞ্চ-উপস্থিতির পর থেকে মাতবর চরিত্রটি যেন বিবর্ণ হয়ে গেছে; এবং দর্শকের নিকট থেকে সে শেষপর্যন্ত সমবেদনা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
গ্রামবাসীর সংলাপের মধ্যে দিয়ে নাটকটি শুরু হয় এবং শাখা-প্রশাখা ধীরে ধীরে  প্রসারিত  হয়ে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাত্রা করে। তাদের সংলাপের মাধ্যমেই উঠে আসে  তৎকালীন প্রতিকূল-পরিবেশ-পরিস্থিতি। যুদ্ধকালে এ দেশে একশ্রেণির দালাল-ভণ্ড-পাকিস্তানের দোসরদের সৃষ্টি হয় যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাশবিকতায় অংশগ্রহণ করে। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেন মুক্তিযোদ্ধারাই এ দেশের শত্রু। আর পাকিস্তানি বাহিনীই বরং ইসলাম ধর্ম বাঁচাতে এসেছে। দেশের মানুষকে রক্ষা করতে এসেছে। নাটকটি যমুনাপাড়ের একটি গ্রাম যা সতেরো গ্রাম নামে পরিচিত। গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই মাতবরের সাক্ষাৎ পেতে অপেক্ষারত।গ্রামবাসিরা যখন মাতবরের কাছে তাদের উদ্বেগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে তখন কাহিনী অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে । ইতিমধ্যে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে । বহূ যুবক মুক্তিযুদ্ধে  অংশ নিয়েছে । গ্রামের স্কুলের মাষ্টার যার সাথে মাতবরের মেয়ের বিয়ের কথা হয়োছল  সে ও অংশ নিয়েছে যুদ্ধে ।মূলত ২৫শে মার্চের পর বিশেষ করে ছাত্র ,জনতা, আর কাল বিলম্ব না করে প্রশিক্ষণ গ্রহনের জন্য কেউ ভারতে,কেউ বা মুক্তাঞ্চালে চলে যাওয়া শুরু করে ।অনেক যুবক এলাকার লোকদের ষ্বাধীনতার পক্ষে সংগ্রামের জন্য  ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নিয়োজত হন । এলাকায় এলাকায় একটি করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয় । যুব সমাজ সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষন গ্রহণ করে এলাকায় এসে অনেক গুলো ছোট ছোট কোম্পানি নিয়ে যৌথভাবে ঘাঁটি গড়ে তোলে ।এই ঘাঁটি থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকায় অপারেশন পরিচালনা করা শুরু করেন । নাটকে সতেরো গ্রামের মাতবর পাকিস্তানের পক্ষে ।গ্রামবাসীকে তিনি বুঝিয়েছেন ,তার অনুগত  লোকেরা ন্যায়ের পথে আছে , ধর্মের পথে আছে । তাছাড়া পাকিস্তান সরকার তো অনেক শক্তিশালী । সুতরাং বিজয় তাদেরই হবে । কিন্তু মিলিটারিকে প্রতিহত করার জন্যে গ্রামগঞ্জে গেরিলা মুক্তিযুদ্ধোদের ছড়িয়ে পড়ার খবরে ভীত গ্রামবাসীরা মাতববরের দেখা না পেয়ে পীর সাহেব কে অনুরোধ করে বলে-“চাই মাতবর সাবেরে ।” আসলে যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা কী সে বিষয়ে তারা জানতে চায় , কেননা এত দিন তারা তাকে সাহায্য করেছে । গ্রামবাসী তার সাক্ষাতের জন্য কাকুতি মিনতি করে ।অপর দিকে প্রতিবাদী যুবক দল মাতবরকে জনসমক্ষে আসতে বলেছে :
দ্যাখা যদি তিনি নাই দিতে চান
হাতে ধইরা না , পায়ে ধইরা না,
ঘাড়ে ধইরাই আন ।
মাতবর যুদ্ধের সব খবর রাখেন; তিনি আড়ালে আছেন গা- ঢাকা দিয়ে ।কেননা এলাকা বাসীর কাছে তার মুখোশ খুলে  গেছে । তিনি গ্রামবাসীকে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য এবং মুক্তিযোদ্ধা থেকে দূরে থাকতে সর্তক করেছিলেন । অথচ সেই মুক্তিবাহিনীর আগমনের  কথা গ্রামবাসী মাতবরকে জানায় ।
অনেকে কই
আসে ঐ  মুক্তিবাহিনী পুব দিকাদিক  দিয়া
যুমনা সাঁতার দিয়া
 অবশেষে রাজাকার মাতবর তার অনুগত লোকদের আহবানে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসেন । কেননা এতদিন তারা মাতবরের পরামর্শ মোতাবেক কাজ করেছিল ।তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা । এমন কি সন্তান হলে ও সম্পর্ক ছিন্ন করার । তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করেছিলেন  দেশের শত্রু হিসেবে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে  কিছু সংখ্যক লোক নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছিলো। গ্রামের সাধারণ মানুষেরা  রাজনীতির ধোকাবাজি  বোঝেনা , তারা ধর্ম ভীরু, তাদের বিপথে পরিচালনা করা সহজ । পাকিস্থান মুসলমানদের দেশ , আর মুসলমানদের মধ্যে শত্রুরা ফাটল ধরাতে চায় । শক্তিশালীদেশকে যারা খন্ড করতে চায় তারা দেশের শত্রু  । এসব কথা বলে  সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছে সুবিধাবাদী গ্রাম্য প্রধান  মাতবর ।
ক্রমাগত যুদ্ধজয়ের খবর শোনে গ্রামবাসী, পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় এবং এক এক এলাকার মুক্ত হবার খবরও পায় তারা। এতদিন মাতবরের কথায় ‘দেশবিরোধী’ কাজে যোগ দেয়নি জনসাধারণ; কিন্তু আর তাদের থেমে থাকা চলে না। মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখাতে চায় তারা। গ্রামবাসীর কথা: ‘আপনের হুকুম মতো এই সারা সতেরো গেরামে/ কোনোদিন কোনো ব্যাটা মুক্তিবাহিনীর নামে/ আসলেই খেদায়া দিছি যেমন ভিটায়/ খা-খা কাক ডাকলে দুপুর বেলায়/ লাঠি হাতে বৌ-ঝি খেদায়/ আপনের হুকুম মতো খোলা রাখছি চাইরদিকে চোখ/ গেরামের মধ্যে কোনো সন্দেহজনক/ ঘোরাফেরা দেখলেই পাছ নিছি সাপের মতোন/হুজুরে হাজিরও করছি দুই চাইরজন।’ কিন্তু সময়ের প্রবাহে ও সংগ্রামের প্রয়োজনে এই উদ্বিগ্ন ও আশাবাদী গ্রামবাসীর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তারা বোঝে মাতবর তাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছে। তাই তাদের সব প্রশ্ন মাতবরকে ঘিরে। মাতবরকে জনসম্মুখে আসতে বলে এবং তাদের প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে বলে।  সৈয়দ শামসুল হক এ কাব্যনাট্যে মাতবরের কৌশল, ভণ্ডামি তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধচলাকালে একশ্রেণির রাজাকার পাকিস্তানিদের তোষণে ব্যস্ত ছিল। তারা দেশের বুকে ছুরি বসিয়ে রক্তাক্ত করতে পিছু হাঁটেনি।
মাতবর গ্রামবাসীদের সঙ্গে যেমন ধূর্ততার আশ্রয় নিয়েছে, তেমনই নিজ কন্যার সঙ্গেও অসৎ থেকেছে। পাকিস্তানিদের লালসার কাছে নিজ  কন্যাকে বিসর্জন দিয়েছে। যুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশের মা-বোনের সম্ভ্রম লুটেছে। হত্যা করেছে। পাকিস্তানি দখলদার ও এ দেশীয় দোসরদের হাতে লাঞ্ছনার শিকারে পরিণত হয় নারী। সৈয়দ শামসুল হক সে চিত্রও তুলে ধরেছেন: ‘মানুষের অধিকার নাই তারে সোয়াল করার/ তবে আছে অধিকার নামটি নিবার/ উচ্চারণ ক্যাবল করার/ আর তাই বা’জান আমার/ আল্লাহতালার নাম নিয়া তিনবার/ আমারে পাঠান তিনি পাপের রাস্তায়/ ‘পরে, পাপ হাজারে হাজার/ মানুষ নিশ্চিত করে, সাক্ষী নাম সেই তো আল্লার/ না, কিছুতেই বা’জানের কোনো বাধে নাই/ কারণ দিছেন তিনি আল্লার দোহাই।’
মাতবর, তার মেয়ে এবং গ্রামবাসীর একের পর এক সংলাপে মুক্তিসংগ্রামের বিষয়গুলো প্রকাশিত হতে থাকে। মাতবর গ্রামবাসীকে জানান, তার মেয়েকে তিনি এক রাতের জন্য হলেও পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে মাতবরের মেয়ে অপমানে-লজ্জায় বিষপানে আত্মহত্যা করে। মেয়ে হঠাৎ বিষপান করে এবং মাটিতে পড়ে যায়। গ্রামবাসী রমণীরা তাকে কোলে নেয়।  ঘটনা এগোতে থাকে। গ্রামের মানুষ মাতবরের মৃত্যু চায়। এদিকে মাতবরের কানে বারবার পায়ের আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। এই আওয়াজ আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের পদধ্বনি। মাতবর সংলাপ আওড়ান, ‘আমারে মারলেই হবে গেরামের বিপদ উদ্ধার?/ আমার তো সকলই গ্যাছে, কিছু নাই আর। / গুলির আওয়াজ শুনি নিকটে এবার/ পায়ের আওয়াজ শুনি মাঠ হয়া পার/…./ আমার জীবন নিয়া তবে কও কি হবে তোমার?’ পীর বলে, ‘উঠায়া নিলেই সব উঠান কি যায়? দাগ একটা রাইখা যায়।/ মাটিতে সে দাগ এত সহজে কি যায়?’ শেষপর্যন্ত দেখা মেলে মাতবরের মৃতদেহ। লেখক বলেছেন: ‘দুম করে গোলা ফাটে। অন্ধকার হয়ে যায়। পর মুহূর্তে আলো জ্বলতেই দেখা যায়, মাথার ওপরে প্রকাণ্ড নিশান, মঞ্চ মুক্তিবাহিনীর লোকে লোকারণ্য। পাইকের এক হাতে লাঠির খোল, অন্য হাতে গুলির রক্তাক্ত ফলা। পড়ে আছে মৃত মাতবর।’
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও এতে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি তেমন কোন দৃশ্য নেই, আছে যুদ্ধের আবহ। নেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, আছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলার মানুষের পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তি অবস্থান। মাতবর, মাতবরের মেয়ে, গ্রামবাসী, পীরসাহেব, পাইক প্রভৃতি চরিত্রের উপস্থিতিতে সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটের নির্মাণ করেছেন। সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে মাতবরশ্রেণী কিভাবে তাদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তা দেখিয়েছেন। শেষপর্যন্ত ঝড়ের কবল থেকে নিজেকে ও একমাত্র সন্তানকেও রক্ষা করতে পারেননি। ভেসে গেছে সবটা। সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাকে অবলম্বন করেই এর দৃশ্যান্তর করেছেন। হাজার বছরের বাঙলির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব অর্জন হয়েছে, তা মাতবরের মেয়ের মতো অসহায় নারী-পুরুষের আত্মত্যাগ ও রক্ত বিসর্জনের ফল।
আলোচ্য নাটকে মাতবর চরিত্রের আদর্শিক অবস্থান সুস্পষ্ট ও সংহত হলেও পীরসাহেব চরিত্রটি কিছুটা রহস্যে ঘেরা। নাটকের প্রারম্ভে তাকে মনে হয় সে রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে আপসকারী ব্যক্তিত্ব; মাতবরের ঘনিষ্ঠ সহচর।কিন্তু নাট্যকাহিনি যতই অগ্রসর হতে থাকে, ততই স্পষ্ট হয় যে, পীরসাহেব ধর্মের ধ্বজাধারী হলেও সে মূলত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। সমালোচকের মতে :
পীরসাহেবের ভাবনার সাথে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক যে বিরোধ তা মূলত ধর্মের সাথে বস্তুজাগতিক জীবনের অসামঞ্জস্যের। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ধর্মে কারো নিষ্ঠা থাকার কারণে আমরা কোনো মানুষকে নঞর্থক চিন্তা চেতনার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না।’
আমাদের বিবেচনায় পীরসাহেব চরিত্রটি একটি স্থিতিস্থাপক চরিত্র; ধর্ম যার প্রধান অস্ত্র, ধর্মকে কাজে লাগিয়ে সে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে সহজেই বিবর্তিত করে অভিযোজিত হতে পেরেছে সমাজে, জনমনে।
আলোচ্য নাটকে মাতবরের পেয়াদা আর একটি সুবিধাবাদী চরিত্র। একদিকে সে যেমন মাতবরের স্বার্থের পক্ষে কথা বলেছে, অন্যদিকে পরিস্থিতি বিরূপ দেখে সহজেই ভোল পাল্টে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়ে নিজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। এমনকি নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে স্বীয় মুনিব মাতব্বরকে গুপ্তির আঘাতে হত্যা করেছে।
 বস্তুত, নাটকে পাইক চরিত্রটি বিশ্বাসঘাতক শ্রেণির। সে তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে, যারা গোপনে এদেশ ও জাতির বুকে ছুরি চালিয়েছে। যুদ্ধকালে এরা পাকিস্তানিদের সহায়তা করে স্বজাতির সাথে বেইমানি করেছে। আবার দেশ স্বাধীন হবার পূর্বলগ্নে ভোল পাল্টিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়ে গিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কিত ও বিতর্কিত করে তুলেছে।
এরা সেই পুরোনো চেনা শকুন, যারা বার বার এদেশের বুকে নেমে এসে জাতির লালসবুজের পতাকাটিকেই খামচে ধরেছে। এদের বিনাশ নেই। এরা এদেশের বুকে অমোচনীয় কলঙ্ক, দীর্ঘশ্বাসময় অন্ধকার। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক ইতিহাসের এই নিমর্ম বাস্তব সত্যটিকে অত্যন্ত ছোট অথচ গভীর পরিসরে এ চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
নাট্যকাহিনির প্রথম পর্যায়েই পাইক চরিত্রটির মধ্যে মাতবরের আদেশ উপেক্ষা করার প্রবণতা তার সুযোগসন্ধানী মানসিকতাকেই প্রকটিত করে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এ পর্যায়ে মাতবরের স্বার্থরক্ষা কিংবা নিরাপত্তা বিধানে তার নির্লিপ্ত মানসিকতা প্রকাশ করেছেন নাট্যকার :
ওর মইধ্যে কি আছে জানি না
অচিন হইয়া যায় চিরকাল্যা চিনা
এতকাল যা দেখেছি দুইচক্ষু দিয়া
য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে এক্কো থাবা দিয়া
য্যান একটা ছোঁ মারলো আচাড়ুয়া পাখি
সোনার দালান খইসা ঝরে কাদামাটি।

তবে নাটকের সব থেকে ট্রাজিক ও মর্মস্পর্শী চরিত্র হলো মাতবরের মেয়ে চরিত্র। নাটকের ভুক্তভোগী অন্যচরিত্রগুলোর সমস্যা সামষ্টিক সমস্যার সঙ্গে একীভূত; সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যেটা অনিবার্য ছিল। কিন্তু মাতবরের মেয়ের সংকট, পরাজয় একান্ত ব্যক্তিগত। নিজ পিতার কুকীর্তির ফলভোগ করতে হয়েছে তাকে সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে। রক্ষক পিতাই তাকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দিয়ে বিনাশকের ভূমিকা পালন করেছে। নিজ পিতার এহেন আচরণ তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। তাই নাটকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে তার এই ব্যক্তিগত শোকের অন্তরবিদারী হাহাকার স্পর্শ করে গেছে নাটকের চরিত্র ছাপিয়ে নাট্য-দর্শক ও পাঠকের হৃদয়তন্ত্রীতে। জন্মদাতা পিতা যেখানে তাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসাবহ্নি থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, ধর্মও যখন তাকে বর্ম হয়ে রক্ষা করেনি, তখন সে শোকে উন্মাদপ্রায় হয়ে জনক ও আচারসর্বস্ব ধর্মের বিরুদ্ধেই হয়ে উঠেছে দ্রোহী।
সে স্পষ্টভাবে সন্দেহের আঙুল তুলেছে ধর্মের সেসব বিধি-বিধানের প্রতি, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণে কার্যকর নয়। তার কেবলি মনে হয়েছে ধর্ম এবং ভিন্নভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ কেবলি চিত্তমোহন বুলিমাত্র; ব্যক্তির রক্ষাকবচ নয় মোটেও। পীরকে উদ্দেশ্য করে তাই সে বলেছে :
আমপারা, সুরা, দোয়া দরুদ, কোরান
পার হইয়া গেছি বাবা আপনের সহায়ে
য্যান এক বিশাল গেরাম, আমার ডাইনে বায়ে
লোকে কথা কয় কিন্তু অচিন ভাষায় তার কিছুই বুঝি না ;
নিশ্চয় নিশ্চয় বাবা, নিরঞ্জন আল্লা নিরাকার –
আরো সত্য, তাঁর ভাষা বহুদূরে আমার ভাষার।
প্রধান চরিত্ররূপে মাতবরের ট্র্যাজিক পরিণতি স্পষ্ট হয় যখন নিজের মেয়ে ওই প্ররোচক-শোষকের শিকারে পরিণত হয়। নিজে যখন মেয়ের প্রশ্নের মুখে পড়ে, নিজে যখন বিবেক-বুদ্ধিতে নিজের সন্তানের ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পায় তখন তার ট্র্যাজেডির স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। মাতবর আর ফিরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় না, অনেক অনুনয়-বিনয় তাকে দুর্বল ও শিথিল মানুষে পরিণত করে। মাতবরের এ শৈথিল্য ও বিবেকবোধ অনেক আগেই নাটকে একটা রূপ নিতে শুরু করে – কেননা মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ের আওয়াজ শুনেছে মাতবর অভ্যন্তর আবহের মধ্যে অনেক আগেই। মাতবরের এ ক্রমশ পরিণতি ক্রমাগত একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে শেষাংশে – এবং শিল্পদৃষ্টিতে তা খুব পরিশীলিত এবং সমুন্নতির মাত্রা স্পর্শ করে। প্রসঙ্গত, মূল্যবোধের একটা পর্যায়কে চিহ্নিত করেন নাট্যকার। মাতবরের পরিণতির পর্বের উচ্চারণ :
কেবল হাতের ’পরে মেয়েটার হাত দিয়া
আল্লাতালার নাম তিনবার নিয়া
কইলাম – কি কইছি, মনে নাই, কিছু মনে নাই,
সোনার পুতুল আমি এইভাবে সাগরে ভাসাই।
সৈয়দ শামসুল হকের শিল্পচিন্তায় নাটকের নানামুখী চরিত্র নির্মাণে ও আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি প্রয়াসের জন্য শব্দ-ইমেজের ব্যবহার বিশেষভাবে আকর্ষণীয়; যেমন মেয়ের উচ্চারণে : ‘সে ক্যান ফালায়া গেলো আমার জীবন/ হঠাৎ খাটাশে খাওয়া হাঁসের মতন?’, কিংবা ‘গ্যাছে সুখ/ য্যান কেউ নিয়া গ্যাছ গাভীনের বাঁটে যতটুকু/ দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহান দিয়া’ ইত্যাদি।
ভোগ, স্বার্থ, ধর্মচর্চা, বিশ্বাস – সবকিছুর মধ্যে প্রশ্নদীর্ণ হয় মেয়ের উক্তি :
যখন আমার বুকে কালসাপ দংশাইয়াছিল
বলেন, জবাব দেন, কোথায় কোথায়?
… … …
সেই এক নাম।
নামের তাজ্জব গুণে ধন্য হয় পাপের মোকাম;
চোরের আস্তানায় হয় বড় কোনো পীরের মাজার।
এক সময় গ্রামবাসীরাও মাতবরের নির্দেশ ‘তথাস্তু’ বলে পালন করেছে; সেজন্য তাদের ভয়-শঙ্কা অস্বীকার করে নির্বিরোধী সবকিছু মেনে নিয়েছে এবং তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কিন্তু এর পরিণামে প্রবঞ্চনা ভর্ৎসনা ছাড়া আর কি কিছু মিলেছে! সেজন্য একতাবদ্ধ গ্রামবাসী বলছে : ‘অসম্ভব কথা, মাতবর/ সতেরো গ্রামে নাই তোমার কবর।’ এক সময় সব কিছুই প্রমাণিত হয়।
পরিণতির পর্বে গ্রামবাসীর প্রতিরোধও মাত্রা পায়। মাতবরের ব্যাপারে গ্রামবাসীর সিদ্ধান্ত : ‘চাই তোমার মরণ/ মরণ, মরণ।’ মাতবরের মৃতদেহ দেখতে চায় না কেউ, কেউ তারে আর এ-গ্রামের মাটিতে স্থান দিতে চায় না : ‘কবর দিলেও তারে উঠাবো সে লাশ খুইরা আবার।’ কিন্তু পীর ত্রিকালদর্শী চিন্তনে উল্লেখ করে : ‘উঠায়া নিলেই কি সব উঠান যায়?/ দাগ একটা দাগ রাইখা যায়।’
মাতবরের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ আর এমন মিথ্যাচারী প্রবঞ্চক যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য শোষকচিহ্নকেও বিলীন করার প্রচেষ্টা চলতে থাকে প্রত্যেক সাধারণ মানুষ তথা গ্রামবাসীর মাধ্যমে। সম্মিলিত সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি যেন প্রত্যেকের মাঝে সমানভাবে সঞ্চারিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত রচিত করে। কাব্যনাট্যে প্রত্যেকে মানুষই সমান শক্তি সঞ্চয় করে মাতবরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কার্যত, কাব্যনাট্যের প্রথম দিকে মাতবরের যে বন্ধনহীন শক্তি ও প্রতাপ লক্ষ করা যায় তাই এখন তার বিপরীত শক্তিরূপে গ্রামবাসীর শোণিতে সমান প্রবাহিত। প্রকৃত অর্থে, জনতার উত্থিত শক্তির মাঝেই মুক্তিযুদ্ধ পেয়েছে বিশাল ব্যাপ্তি।

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন