গল্প। শিউলি ঝরাদিন
আনোয়ার রশীদ সাগর
ভোর পাঁচটা। আকাশে এখনো অন্ধকারের আঁচল লেগে আছে। শিউলি গাছের তলা সাদা চাদরে ঢেকে যেত। যেন রাতের পরিরা ফুল ছড়িয়ে গেছে।ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর সেরা ঘ্রাণ।
শারমিনের বয়স তখন ১২। সে দৌড়ে যেত গাছের নিচে। ওড়নার আঁচল পেতে ফুল কুড়াতো। লাল ডাঁটিওয়ালা শুভ্র ফুলগুলো। হাতে ধরলে গন্ধে হাত ভরে যেত। ভরে যেত হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীরব আনন্দগানে।
"মা, দেখো কত ফুল পাইছি"— দৌড়ে এসে মা রাশিদা বেগমের কোল ঘেঁষে বসতো।
রাশিদা সূচ-সুতা ঠিক করে দিতেন। মা-মেয়ে মিলে মালা গাঁথতেন। একটা একটা করে ফুল গেঁথে যেত, আর সাথে গাঁথা হতো স্নেহ-ভালোবাসা-মায়ামমতা।
সারাদিন সেই মালা দেওয়ালের পেরেকে ঝুলতো। ঘরময় শিউলির গন্ধ। যেন দেবতার পায়ের গন্ধ।
রাত হলে শুকিয়ে যেত ফুলগুলো অথবা ঘ্রাণ থাকতো ঘরময়। সোহেল ছোট। শারমিনের এক বছরের ছোট। সারাদিন খুনসুটি।
"আমার মালা তুই ছিঁড়ছিস কেন?"
"তুই আগে আমার পেন্সিল নিছিস।"
শেষে দুইজনেই মায়ের কাছে বিচার। রাশিদা দুইজনকেই বুকে টেনে নিতেন। আঁচলের ছোঁয়া দিয়ে আদর করতো "আহা, আমার সোনার টুকরা দুইটা।"
সেই বাড়িতে জীবন ছিল। পাখির গান ছিল ভোরে। নদীর স্রোতের শব্দ ছিল দুপুরে। পাখির মতো কলরব ছিলো উঠোনময়। শীতের পিঠার ঘ্রাণ ছিল রান্নাঘরে। সন্ধ্যায় সন্ধ্যাবাতি জ্বলতো। তুলসী তলায় ধূপ। গোয়ালের পাশে সাজাল — ল্যাম্পের আলোয় গরুর গা চকচক করতো।
মিজানুর রহমান মাঠ থেকে ফিরে উঠোনে বসতেন। রাশিদা চা দিতেন। শারমিন-সোহেল পায়ের কাছে লুটোপুটি খেতো,ঠেলাঠেলি করতো।
জীবনটা ছিল মাটির মতো। আস্তে, ধীরে, ঘ্রাণভরা ভালোবাসার সংসার চলছিল।
তারপর সময় বদলালো। উঠোনে কারেন্টের বাল্ব এলো। ঝলমলে আলো। কিন্তু জোনাকি হারিয়ে গেল।হারিয়ে গেলো,আবেগ-অনুভূতি। মাঠে বিষাক্ত ঔষধ এলো। ফলন বাড়লো। কিন্তু মাটির গন্ধ মরে গেল।মরে গেল পাখিগুলো। হারিয়ে গেল,গোধূলির কিচিরমিচির শব্দ। মশার কয়েল এলে, ধূপের গন্ধ হারিয়ে গেল।
শারমিন বড় হলো। সোহেলও। শারমিনের বিয়ে হলো নাবিলের সাথে। শহরের ছেলে,শারমিনের পছন্দের ছেলে । চাকরি করে। সোহেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সেখানে রীনার সাথে প্রেম হয়। রীনাকে নিয়েই তাদের সংসার। বাড়ি খালি হতে লাগলো। যেমন ভরা কলসি থেকে পানি কমে গেলে তলানি পড়ে যায় তেমন। জমতে থাকে ময়লা।
রাশিদা বেগম রাতে স্বামীর পাশে শুয়ে বলতেন,
"ওরা তো ছুটিতেও ঠিক মতো আসে না গো।"
মিজানুর রহমান ছাদের দিকে তাকিয়ে বলতেন, "ওদের সংসারের ব্যস্ততা আছে না?"
"তাই বলে, বাবা-মা'র সাথেও একটু সময় দেবে না?"
মিজানুর বুকের বাম পাশটা চেপে ধরতেন। "যান্ত্রিক যুগ রাশিদা। ওদেরও কতোরকম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়! যন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ওরাও হাঁপিয়ে ওঠে।"
রাশিদা কিছু বলতেন না। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতেন। গোপনে। যেন কেউ না দেখে।
মিজানুর রহমানের বয়স ৬৫। হঠাৎ বুকের ব্যথা। ডাক্তার বললো, "হার্টের সমস্যা।"
শারমিন এলো দুই দিনের জন্য। সোহেল এলো একদিনের জন্য। ঔষধ কিনে দিয়ে যাওয়ার সময় মাকে ধরে আদর করে বলে,
"আম্মা, আপনি আমাদের বাসায় চলেন।"
রাশিদা হাসলেন। "না রে মা। আমার ঘর আছে। আমার কতো স্মৃতি এই বাড়ি,এই গাছগাছালি,হাঁস মুরগী, ঘরদোর পুকুর ঘাট থুয়ে যায় কী করে?
আমি গেলে হয়?"
তিন দিন পর ওরা চলে যায়, যারযার মতো করে। বাড়িটা আবার নীরব হয়ে যায়। রাশিদার বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে। যেন পাখির খাঁচা খালি হয়ে গেছে। মিজানুর রহমান আস্তে আস্তে দুর্বল হতে লাগলেন। মাঠে যাওয়া বন্ধ। উঠোনে চেয়ারে বসে থাকেন।
এক ভোরে মিজানুর আর উঠলেন না।
শিউলি ফুলের মতোই নীরবে ঝরে গেলেন।অসাড়তা নিয়ে জীবনের ইতি টানলেন।
জানাজায় শারমিন আর সোহেল এলো।আপনজন,আত্মীয়-স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কাঁদলো।কিন্তু কর্মজীবনের ডাকে, তিন দিনের বেশি থাকতে পারলো না। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে হলো। একবার মায়ের দিকে তাকায় আর একবার বাবার কবরের দিকে।যাওয়ার সময় সোহেল বললো, "আম্মা, এবার কিন্তু যেতেই হবে। একা থাকবেন কেমনে?"
রাশিদা মাথা নাড়লেন। "দেখি।"
লোকজন চলে গেল। বাড়ি আবার খাঁখাঁ। রাশিদা রাতে রান্না করেন একজনের জন্য। থালায় ভাত বাড়েন দুইজনের জন্য। অভ্যাস। অনেক দিন ভাত খাওয়া হয় না,মুখে ভাত ওঠে না। রান্না হয়,চেয়ে চেয়ে দেখে শুধু। এভাবেই স্বাভাবিক হতে থাকে চলমান জীবন।রাতের বেলা দেওয়ালের পেরেকে আর শিউলির মালা ঝুলে না। শুধু মাকড়সার জাল জমে।
এক মাস পর সোহেল জোর করে নিয়ে যায়। "আম্মা, তিনটা দিন অন্তত থাকেন।"
শহরের ফ্ল্যাট। ৮ তলা। লিফট। এসি। রীনার সংসার গোছানো। ফ্রিজ ভরা খাবার। কিন্তু জানালা দিয়ে শুধু বিল্ডিং দেখা যায়।নেই সবুজ গাছগাছালি, পুকুর ঘাট, হাঁসমুরগি বা পাখির কলতান। সকাল-বিকাল আসে না, প্রতিবেশী মহিলারা গল্প করতে।
প্রথম দিন ভালো লাগলো। দ্বিতীয় দিন বুক ধড়ফড়।
তৃতীয় দিন রাশিদা বললেন, "বাবা, আমি বাড়ি যাবো,এ জেলখানায় থাকতি পাইরবু না।"
"কেন আম্মা?"
"দম আটকিয়ে আসে বাবা। আমার ঘর ডাকে। আমার উঠোন তাকিয়ে থাকে ।"
মায়ের অসহায় মনের অবস্থা দেখে, সোহেল আর জোর করলো না। পৌঁছে দিয়ে গেল।
শারমিনের বাসায়ও একই অবস্থা। দুই দিন থেকে রাশিদা কাঁদতে লাগলেন। "আমার উঠোন নাই। আমার সাজাল নাই।" মনের ভিতর উথাল-পাতাল করে বাড়ির জন্য।
নাবিল বললো, "আম্মা, আপনার জন্য কষ্ট হয়।"
রাশিদা বললেন, "আমার কষ্ট আমার ঘরেই ভালো বাবা"।
এখন রাশিদা একা। সকালে উঠে শিউলি কুড়ান। কিন্তু মালা গাঁথার মানুষ নাই। ফুলগুলো ঝুড়িতে পড়ে থাকে। শুকিয়ে যায়। দুপুরে ভাত রাঁধেন। একটা প্লেট বাড়েন। খেতে বসে মনে হয় টেবিলের ওপাশে কেউ বসে আছে। বিকেলে উঠোনে বসেন। পাখি ডাকে। কিন্তু সেই ডাকেও একাকিত্বের সুর। রাতে ঔষধ খান। বুকের বাম পাশে ব্যথা। মিজানুরের কথা মনে পড়ে। "আমাকে একা রেখে গেলা?" — বিড়বিড় করেন। উত্তর আসে না।
মাঝে মাঝে ফোন আসে। "আম্মা, কেমন আছেন?"
"ভালো আছি মা।"
ফোন রাখার পর আঁচল ভিজে যায়।
রাশিদার জীবনটা এখন পুরনো ঘড়ির মতো। কাঁটা চলে, কিন্তু টিকটিক শব্দ নাই।
তিনি বলেন, "মানুষ বুড়া হলে গাছের শুকনা পাতার মতো হয়ে যায়। বাতাসে উড়ে। কেউ ধরে না।"
শিউলি গাছটায় এখনো ফুল ফোটে। ভোরে সাদা হয়ে থাকে উঠোন। রাশিদা ফুল কুড়ান। কিন্তু ওড়নার আঁচল ভরেন না। কারণ মালা গাঁথার কোল নাই।
মাঝে মাঝে সোহেল ভিডিও কল দেয়।সোহেলের ছেলে হুমহাম করে। সবাই মনে করে দীদা বলেই ডাকছে। দূর থেকে রাশিদা বেগম, 'দাদু ভাই দাদু ভাই' বলে আদর করে । "দাদু, দেখো।" রাশিদা নাতির দিকে তাকিয়ে হাসেন। ফোন কাটার পর দীর্ঘশ্বাস।
শরতের সাদা কাশবনের বিদায়বেলা,ফুলগুলো উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তের অজানায়। রাশিদার জ্বর। শারমিন আর সোহেল দুইজনেই ছুটে আসে। হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার বললো, "নিউমোনিয়া। সাথে একাকিত্ব।"
তিন দিন পর রাশিদা একটু সুস্থ। সোহেল বললো, "আম্মা, এবার আর না বলবেন না। আমার সাথেই থাকবেন।"
রাশিদা চোখ বন্ধ করলেন। "বাবা, আমাকে বাড়ি নিয়ে চল। মরতে হলেও নিজের ঘরে মরবো। "ছেলে-মেয়ে কেউ কথা বললো না। বুঝলো।
বাড়ি ফিরে এলেন। সেই রাতে জ্বর বাড়লো। শিউলি ফোটা ভোরে রাশিদা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
হাত বাড়িয়ে বললেন, "মিজান... ফুল কুড়াও..."
তারপর হাতটা নেমে গেল।
উঠোনে শিউলি ঝরে পড়ছিল বাতাসে। নীরবে নিভৃতে।
চল্লিশার দিন শারমিন আর সোহেল এলো। উঠোন ঝাড় দিলো। শিউলি গাছের নিচে বসলো। সোহেল বললো, "আপা, আম্মা এইখানে বসে ফুল কুড়াতো। "শারমিন কাঁদলো। "আমরা সময় দিতে পারলাম না রে ভাই।"
রীনার কোলে ছোট বাচ্চা। নাবিল পাশে দাঁড়িয়ে।
সবাই আছে। কিন্তু রাশিদা নাই। সন্ধ্যায় সবাই চলে যায়। বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে যায়, খাখা করে।
শিউলি গাছটা বাতাসে দোলে। ফুল ঝরে। কেউ ওড়নার আঁচল পাতে না। কেউ মালা গাঁথে না। আমরা উন্নতির নামে আলো জ্বালাই, কিন্তু ঘরের অন্ধকার বাড়াই। আমরা ঔষধে ফসল ফলাই, কিন্তু সম্পর্কে বিষ ঢালি। আর শেষ বয়সে মা-বাবারা একটা কথাই ভাবে, "আমার সন্তান ভালো আছে। আমি না হয় একাই থাকি।"
শিউলির আঁচলটা আজও খালি পড়ে আছে। শুধু স্মৃতিগুলো ফুলে ভরা।
আরো পড়ুন....
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে
বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা পড়ুন এখানে
নাগিব মাহফুজ এর উপন্যাস ভিখারি পড়ুন এখানে
কবি আমিনুল ইসলামের দারুণ কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদদ্ীন লোদীর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
রোকসানা ইয়াসমিন মণির কবিতা পড়ুন এখানে
মতিন বৈরাগীর কবিতা এখানে পড়ুন
মাসুদ মুস্তাফিজের কবিতা পড়ুন এখানে
অমিত চক্রবর্তীর কবিতা পড়ুন এখানে
বড় ও বিখ্যাত কবির কবিতা পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks