মোহাম্মদ জাফর সাদেক এর কয়েকটি কবিতা
মাটির ভিতর যে নদী
মাটির ভিতর নদী বয়ে যায়—তার কোনো মানচিত্র নেই।
কেঁচোর অক্ষরে লেখা তার গোপন জলপত্র।
ধানের শিষে ভোর নামে, শিশিরে মায়ের নাম।
ভাঙা লাঙল পড়ে থাকে কৃষকের নীরব কাঁধে।
কাদার গন্ধে জেগে ওঠে আদিম মাটিস্মৃতি।
বউকথাকও ডাকে—বাঁশবনে হারানো সংসার।
পুকুরে চাঁদ নয়, ডুবে থাকে রুপালি জলছায়া।
নদী ভাঙে, ভাঙনের পাঁজরে জন্ম নেয় চর।
মাটির নিচে ঘুমায় পূর্বপুরুষের ঘামমহাকাব্য।
মানুষের শেষ ঠিকানা—এক মুঠো ভেজা পৃথিবী।
কুয়াশার ভিতর হেমন্ত
কুয়াশা ভোর ঢাকে—আকাশ মাটির কাছে বন্ধকী।
পাকা ধানের গন্ধ ওঠে নাভিমূলের প্রার্থনা হয়ে।
শিশিরে ঘাস বাজায় ক্ষুদ্র জলঘণ্টা।
তালগাছেরা কুয়াশায় অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক স্মৃতি।
কৃষকের পায়ে মেঠোপথের ঘুম ভাঙে।
গরুর ঘণ্টি বলে—দিন এসেছে, ভাতেরও দিন।
চুলোর ধোঁয়া ওঠে উষ্ণতার কালোমেঘ হয়ে।
কাশফুল দোলে—দেশজ কোনো অনুবাদহীন মন্ত্রে।
হেমন্তের রোদ উঠোনে বসে অতিথি হয়ে।
বাংলা তখন মাটির হৃদয়ে সবুজ হয়ে ওঠে।
জলের স্মৃতি
পুকুরে মুখ ধুলেই শৈশব চোখের ভিতর জেগে ওঠে।
কলসির জলবিন্দু—গৃহস্থালির ক্ষুদ্র নক্ষত্র।
নদী জানে কত পায়ের ধুলো তার স্রোতে মিশেছে।
দাঁড়ের টানে ঢেউ লেখে প্রাচীন জলব্যাকরণ।
বর্ষায় খাল উঠোন ছোঁয়—ঘর হয় স্মৃতিদ্বীপ।
পানকৌড়ি ডুব দেয়, যেন জল খোঁজে নিজের মুখ।
কুপিবাতি জ্বলে—অন্ধকারে আশাবীজ হয়ে।
খরায় পাঁক ফাটে, পৃথিবীর দুঃখ মুখ দেখায়।
বৃষ্টি আসে, মাটি শেখে সবুজ উচ্চারণ।
জল শুধু জল নয়—সে জন্ম, স্মৃতি ও প্রত্যাবর্তন।
লাঙলের অক্ষর
লাঙলের দাগ মাটির অক্ষর—পৃথিবী ছাড়া কেউ পড়ে না।
প্রতিটি রেখায় বৃষ্টি, বীজ, অনাগত ভাত।
কৃষকের পিঠে দুপুর পুড়ে তামার মতো।
ঘাম পড়ে মাটিতে, ধানে হয়ে ফিরে আসে সূর্য।
শহরের অর্থনীতির অন্য নাম—এক মুঠো ধান।
খরায় মাঠ ফাটে মায়ের কপালের মতো।
তবু কৃষক বোনে—আশার কৃষিজ ব্যাকরণে।
ধানক্ষেত দোলে, সবুজ জনপদ প্রণাম করে।
লাঙল সন্ধ্যায় ফেরে ক্লান্ত সৈনিকের মতো।
মানুষের প্রথম কবিতা—লাঙল দিয়ে লেখা, মাটি তার কাগজ।
উঠোনের চাঁদ
কাঁচা উঠোনে চাঁদ নামে না—নামে সাদা নীরবতা।
মায়ের কলসিতে আলো—গোপন রুপার পাত্র।
চুলোর ছাই বহন করে দিনের আগুন।
বাবার গামছায় শুকায় মাঠের ঘাম।
দাওয়ার বিড়ালটি রাতের অদৃশ্য পাহারাদার।
কুয়োর জলে উল্টো আকাশ—দরিদ্রের নক্ষত্রস্বপ্ন।
মায়ের পায়ের শব্দে ভোরের প্রথম অক্ষর।
ঝাড়ু দেওয়া মাটিতে শিখেছি ঘরের মাতৃভাষা।
শহরের জানালায় আজও সেই উঠোন খুঁজি।
কংক্রিটের আকাশে তার কোনো প্রতিলিপি নেই।
মেঠোপথের দর্শন
মেঠোপথ মানুষের পায়ের নিচে লেখা আত্মজীবনী।
তার বাঁকে গরুর খুর, শিশুর দৌড়, কৃষকের ক্লান্তি।
বর্ষায় কাদা, শীতে ধুলো, বসন্তে ঘাস।
শিমুল দাঁড়ায় আগুনরঙা মাটিঋষির মতো।
বৃদ্ধ জানেন—কতজন গেছে, কতজন ফেরেনি।
সন্ধ্যায় গরুর পালে জেগে ওঠে ঘরের গন্ধ।
বই ও কাস্তে পাশাপাশি হাঁটে একই পথে।
পথ জানে—সব গন্তব্য একদিন দরজায় থামে।
তবু যাত্রা গন্তব্যে নয়, পায়ের ধুলোয়।
মেঠোপথ হারায় না—সবুজ হয়ে আবার জন্ম নেয়।
শিউলি ভোর
শিউলি ঝরে—শব্দহীন, অথচ ভোর বদলে যায়।
ঘাসে কমলা ডাঁটি—রাতের ফেলে যাওয়া নক্ষত্র।
দাদির আঙুলে লেগে থাকত সেই গন্ধ।
পুকুরে কুয়াশা, হাঁসের ডানায় ভোরের আলো।
আজানের সঙ্গে পাখির ডাক—বহুভাষী প্রার্থনা।
ধানের ডগায় শিশির—সূর্যের অনাগত মুখ।
আমাদের কত সুখ শিউলির মতো ঝরে যায়।
দিনে ফুল মাড়ায়, গন্ধ মাটিতে থেকে যায়।
ভোর ফুরোয়, ফুল শুকোয়, স্মৃতি শুকোয় না।
শিউলির গন্ধে মানুষ তার হারানো ভোর খুঁজে পায়।
মাটির বুকে
হে মাটি, মুকুট নেই—পায়ের ধুলোয় লেখা স্বীকারোক্তি।
দেখেছি নদী ভাঙে, কাশফুল আবার ঘর তোলে।
কৃষকের কপাল পুড়ে, চোখে জাগে ধানের ভবিষ্যৎ।
জেলের জালে অন্ধকার থেকে উঠে আসে জীবন।
চুলোর ধোঁয়াই ছিল আমার প্রথম আকাশ।
বাঁশঝাড়ে শুনেছি পূর্বপুরুষের পদধ্বনি।
দেশজ শব্দে লেগে আছে ঘাম, বৃষ্টি, শস্যের গন্ধ।
তুমি শিখিয়েছ—শিকড় মানুষের ভিতরেই জন্মায়।
সব শব্দ ফুরোলে শেষ অক্ষর তোমার বুকেই লিখে রেখে যাবো।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks