গরীবের উৎসব
শিপুর মন খুব খারাপ!
নববর্ষে সে, খুব খুব মজা করতে চেয়েছিল।
কিন্তু ওই পাশের বাড়ির বিড়ালটা, তার সব আনন্দ ছাই করে দিয়েছে।
শিপুর স্যার নববর্ষের ঠিক আগের দিন,
ক্লাসের সবাইকে বলেন, " আগামীকাল বছরের যে নতুন দিন, তোমরা নিশ্চয় জানো? আর নতুন দিনে কম বেশি অনেকেই পান্তা ইলিশ খায়,রঙ খেলে
নদীর ঘাটে বা বটমূলে মেলা বসে।দলে দলে ছেলে মেয়ে মেলা যায়। গুরের জিলাপি, মাওয়া,ঘোলা দই এসব মেলায় সবাই খায়।
মেলায়, বানর খেলা, কাটা ঘুরা খেলা ও লাঠি ঘুরা খেলাও বসে।
খুব আশ্চর্যজনক খেলা। স্যার আরো বলেন- শুনো সবাই
আগামীকাল পহেলা বৈশাখ। নববর্ষ উৎসব এবার থেকে আন্তর্জাতিক ভাবে মঙ্গল শোভা নামে পালিত হবে। যাহোক
আগামীকাল আমরা সবাই
কাচা মরিচ ও ভাজা মাছ দিয়ে পান্তা খাবো সবাই সবার বাড়িতে। সারা দেশে ধনীগরিব নবর্ষের দিনে পান্তা ভাত খায়।
এ দিনে ধনী গরীবের কোন ভেদাভেদ নেই।
গরীবেরা যা রোজ মাটির বাসনে খায়, বছরের প্রথম দিনে, ধনীরাও তাই খাবে।
শিপু স্কুল থেকে এসেই তার মাকে বলে,, " মা আমরা কিন্তু কালকে পান্তা ইলিশ খাবো,,, কাল নাকি সবাই পান্তা খাবে,,
?
আমরা তো রোজ পান্তা খায়,
কিন্তু কাল সবার মতো, মাছ দিয়েই খাবো।
শিপুর মা, ছেলের এমন হাসি খুশি মাখা আবদারে, খানিকটা চুপ থেকে সোহাগি সুরে বলেন-" শিপু ইলিশ মাছে তো অনেক কাটা,,, পান্তা তো মজা করে খেতেই পারবিনা বাবা!
তার চেয়ে তোর পছন্দের দেশী তেলাপিয়া মাছ হলে,, কেমন হবে?
শিপু " মাছ ভাজা হলেই হলো, তবে, কাল পান্তার সাথে মাছ আমার চাই কি চাই।।।
ইলিশ কিনা সামর্থ,, মায়ের নেই!
তাই ছেলেকে, ইলিশে যে অনেক কাটা -এ কথা বলে একটি আবদার, বদলানো হয়।
সকাল হলো, ঘরে ঘরে নবর্ষের রই রই,, আনন্দ! ছোলা মুড়ি ঘরে ঘরে,,
সবাই ঘরদোর ধোয়া মোছা করছে- গরু ছাগলের ভিড় মাহাজনের পুকুর ঘাটে। সবাই সবার গরু ছাগল চান করাচ্ছে।
রুনু ঝুনু, পিপলী -এরা শিপুর খেলার সাথী। এই খেলার সাথীরা হঠাৎ
শিপুকে ধরিয়ে, রাঙিয়ে তোলে রকমারি রঙে
! সবাই লাল কালো ভুত হয়ে গেছে রঙ খেলায়। এবং সব ভুত ছুটে পুকুরে -
শিপু ও তার খেলার সাথীরা পুকুরে লুকোচুরি ডুব দিয়ে চান করে।
তার মন খুশিতে ঝলমল করছে, চারদিক কেমন যেন নব বর্ষের নব আয়োজন,, আনন্দে আকাশ বাতাস দোলে।
এদিকে শিপুর মা, বাড়ির সব কাজ সেরে পান্তার বোল, কাচা মরিচ, ও কাচা রসুন দিয়ে ভুনো আলু ভর্তা -বারান্দায় নিয়ে আসে।
শিপু, তার লাল প্লেটে পান্তা তোলে। ভাজা মাছের বাটিটা নিতে মা ঘরে ঢুকেন।।।।
মা দেখে-
আশ্চর্য বাটিটা পড়ে আছে! কিন্তু মাছ?
ভেজে রাখা মাছ গুলো, কি হলো?
টেবিলের নীচে ছোট ছোট চিরুনির মতো মাছের কাটাগুলো পড়ে আছে।
কাটা গুলোকে আকঁড়ে ধরে আছে লাল লাল পিঁপড়ে।
শিপু পান্তার প্লেট সামনে নিয়ে -
মা মা করে ডেকে বলে- ও মা কই গো, মাছ দাওনা? ঘরে এতক্ষণ, কি করছো?
মাছ ভাজা , জলদি দাওনা--
মা তো হতভম্ব
-
কি করবে এখন?
শিপুকে কি দেবে? কেমন করে বলবে তাকে,, বাবা মাছ নেই- বিড়ালে খেয়ে ফেলেছে সব মাছ!
ছেলের হাসি মাখামুখ মলিন হোক, কোন মায়েই তো চায়না, কিন্তু এখন----- মহা ভারী ভাবনা যে,,,!!!
শিপু, মায়ের সারা না পেয়ে ঘরে ঢুকে,,, আর মায়ের হাতে শূন্য বাটি দেখে অবাক হয়,, পায়ের নীচে, মাছের কাটা পিঁপড়েরা নিয়ে যাচ্ছে আনন্দ মিছিলে,,,
শিপুর দিকে তাকাতেই, মায়ের টপাটপ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে বিষণ্ণদেহে!
শিপুর মা ভাবেন, গরীব ধনী কখনওই কোনদিন এক হতে পারেনা,, এক খাবার খেতে পারেনা। যদিই একই হতো -খাওয়া দাওয়া, চলাফেরায়, আনন্দ উল্লাসে -
তাহলে অভিধানে গরীব ধনী শব্দ দুটো বিপরীতার্থক অর্থ হতোনা।
হতো সমার্থক।
নতুন বছরের নতুন দিনের সূর্যটা ঠিক মাথার ওপরে রোদ বাতাসে মাখামাখি ,,
অশ্রু কষ্টের সুরে, সারা ঘরের আনন্দ কালচে হতে থাকে-
শিপুর, আলু ভর্তা কোঁচলানো পান্তার থালা পরে থাকে ওভাবেই,,,,
শিপুর মা, পান্তার বোলের দিকে তাকিয়ে অভিমানী কন্ঠে বলে, কোন উৎসবেই আমার মতো গরীবের কপালে যে সয়না বাবা!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks