কবিতায় মিথ প্রসঙ্গ
(প্রবন্ধ)
আধুনিক কাব্যে মিথ বা পুরাণ যে ব্যঞ্জনাময় প্রভাব বিস্তার করেছে লোকসংস্কৃতির অন্যকোন উপাদান তা করেনি। তাই মিথ সম্পর্কে আলোচনা নিতান্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।
অজানাকে জানার, অধরাকে ধরার, অদৃশ্যকে দেখার, অজেয়কে জয় করার, অচিন্ত্যকে চিন্তাগত করার দূর্নিবার আকাঙ্ক্ষা থেকেই মিথ(Myth) বা পুরাণ চেতনার উদ্ভব। প্রাক-সভ্যযুগে আদিম মানুষ যখন সর্বপ্রাণবাদের (Animism) স্তর অতিক্রম করে সবেমাত্র সংহত জীবনে (Pluralism) প্রবেশ করেছে। তখন জীবন-জীবিকা, জন্ম-মৃত্যু চারপাশের প্রকৃতি তথা বস্তুবিশ্বের দুর্জ্ঞেয় রহস্য তার হৃদয়ে যে বিস্ময়াবিষ্ট কৌতূহলের জন্ম দিত, সেই প্রাচীন রহস্য উদঘাটনে তার বিশ্বাসজাত ও চিন্তাপ্রসূত প্রতীকি প্রকাশ হল পুরাণ। পুরাণ তাই লোক মানস উদ্ভাসিত একপ্রকার কল্পনালব্ধ জ্ঞান। আশুতোষ ভট্রাচার্যের মতে, 'সৃষ্টির দুর্ভেদ্য রহস্য ভেদ করার কৌতুহল নিয়ে অপরিণত বুদ্ধি মানব একদিন যে সকল অলৌকিক কাহিনী বা পুরাকাহিনী রচনা করেছিল, ইংরেজিতে তাকেইমিথ(Myth) বলে। বাংলায় তাকে লৌকিক পুরাণ বা পুরাণ কাহিনী হিসেবে অভিহিত করা যায়। কিন্তু লৌকিক পুরাণের 'পুরাণ' শব্দটি অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, কেননা আভিধানিক অর্থে পুরাণ শব্দ দ্বারা বৈদিক যুগের পরবর্তীকালের ইতিহাস বা জনশ্রুতি অবলম্বনে মনীষী ব্যাসদেব কর্তৃক সংকলিত শাস্ত্রগ্রন্থকে বুঝায়। বিষ্ণু পুরাণ,ভাগবত পুরাণ প্রভৃতি 'অষ্টাদশ পুরাণ' ছাড়াও আরো অনেক উপপুরাণ এর অন্তর্গত। সর্গ,প্রতিসর্গ,বংশ,মন্বন্তর ও বংশানুচরিত এই পাঁচটি পুরাণের লক্ষণ।
মূলত সৃষ্টি উৎপত্তি, প্রকৃতি, নিসর্গ, নিয়ম, ত্যাগ, বিসর্জন, দেবচরিত, বিভিন্ন মুনি-ঋষির অধিকার কাল এবং এ ধরনের শাস্ত্রকল্প বিষয়াদিই পুরাণের বিষয়। সুতরাং 'পুরাণ' শব্দ দ্বারা ধর্ম,ধর্মাচার বিশেষত বৈদিক মতে সৃষ্টিতত্ত্ব, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কিত ধর্মীয় ধারণাই ব্যক্ত করা হয়। পৌরাণিক বিষয় দ্বারা ভূত-ভবিষ্যৎ ও বর্তমান অবস্থার পরিজ্ঞান, জ্ঞানের নির্মলতা ও বুদ্ধির প্রাখর্য জন্মে। কিন্তু পরবর্তীতে শব্দটির অর্থ সম্প্রসারণ ঘটে। নৃ-বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞানের পরিভাষায় Myth বা পুরাণ বলতে এমন সব কাহিনীকে বুঝায়, যা প্রাগৈতিহাসিক কালের কোন অসাধারণ মানুষের বিস্ময়কর কার্যকলাপ অথবা প্রকৃতি দুর্জ্ঞেয় রহস্য, যথা-ঋতু,জল,সূর্য প্রভৃতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করে। E.E. Kellet এর মতে,'মহাজাগতিক সৃষ্টি কাহিনীমূলক লৌকিক আখ্যানকেই পুরাণ বা Myth বলে।
বাংলায় একে লৌকিকপুরাণ বা পুরাকাহিনী বলা যায়। কিন্তু লৌকিক পুরাণের ‘পুরাণ’ শব্দটি অনেকের মনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, কেননা আভিধানিক অর্থে পুরাণ শব্দ দ্বারা বৈদিক যুগের পরবর্তী কালের ইতিহাস বা জনশ্রুতি অবলম্বনে মনিষী ব্যাসদেব কর্তৃক সংকলিত শাস্ত্রগ্রন্থকে বুঝায়। বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ প্রভৃতি ‘অষ্টাদশ পুরাণ’ ছাড়াও আরো অনেক উপপুরাণ এর অন্তর্গত। সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত- এই পাঁচটি পুরাণের লক্ষণ।
রাগলার এর মতে, Myth হলো, A narrative linked with a rite.অর্থাৎ অতীত কোন ব্রতানুষ্ঠান কিংবা তার স্মৃতিবহ ঘটনাই মিথ। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এনড্রিউ ল্যাং, জর্জ ফ্রেজার প্রমুখ অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে আদিম যুগের মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের ক্রমধারা বা survival মিথের মধ্যে সংরক্ষিত। মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হয়েছে, পৃথিবী এগিয়ে চলছে,সভ্যতার বিস্তৃতি ঘটছে। মানুষের প্রাচীন সব বিশ্বাস ও ধারণা বিজ্ঞানের বাস্তব বুদ্ধির সংঘাতে অনেকটাই অসার ও আজগুবি প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বহু প্রাচীন জাতির মধ্যে প্রাচীন বিশ্বাসের ধারা তাদের জীবন ও জীবিকার বিচিত্র অনুষঙ্গে মিশ্রিত হয়ে এখনও বর্তমান। মনোবিজ্ঞানী সিগমণ্ড ফ্রয়েড এবং তাঁর অনুসারী আরনেস্ট জোন্স, এরিক ফ্রম, কার্ল ইয়ং, জোসেফ ক্যাম্পবেল প্রমুখ পণ্ডিতদের মতে মিথের উদ্ভব হলো প্রথমত আদিম মানবের স্বপ্ন থেকে এবং সেই স্বপ্নবৃত্তান্তের কাহিনী থেকে পরিশেষে লোকপুরাণ, লোককাহিনী, রূপকথা, প্রভৃতির উদ্ভব হয়েছে। নৃবিজ্ঞানী লেভাই স্ট্রস এর মতে Myth হলো মানুষ ও প্রকৃতির বিস্ময়কর সব ঘটনার প্রতীকি প্রকাশ। মনোবিজ্ঞানীর Jung অবশ্য মনে করেন, মানুষের সমষ্টিক অবচেতনে ( collective unconcious) মনোবাস্তবতার বাইরে অনাস্বাদিত যে পথ মানুষ কখনো মাড়ায়নি, মানবিক চেতনার সেই গভীরতর প্রদেশে মিথের অবস্থান। এদিক দিয়ে পুরাণ, কিংবদন্তী,স্মৃতিকথা, রূপকথা মিথের পর্যায়ক্রমিক সাধারণীকৃত ধাপ।
উপরিউক্ত মন্তব্য ও মতামত পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, মিথ বা পুরাণ অসীম তাৎপর্যের ধারণ। যার বৈশিষ্ট্যগুলো সাজালে দাঁড়ায় নিম্নরূপঃ
১. মিথ আদিম মানুষের জীবজগৎ সম্পর্কিত বিজ্ঞান পূর্বযুগের ধ্যান ধারণার প্রকাশ, যা প্রকৃতি ও মানুষের অসীম রহস্য উদঘাটনে প্রয়াস পেয়েছে। কিন্তু আধুনিক শিল্প সাহিত্য মিথকে ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা কিংবা প্রতীকরূপে গণ্য করা হয়। সুতরাং বলা যায় চলমান বাস্তবতাকে মিথ অতীত প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করে।
২. মিথ মানুষের গভীরতম বাসনার, যা তার বিশ্বাস, আকাঙক্ষা ও ভীতির সাথে অন্তরস্থিত বাস্তব বোধের প্রকাশ। বহির্বিশ্বে বাস্তবতার চাইতে অন্তরবাস্তবতার সাথে, মানবমনের দুর্জ্ঞেয় রহস্য ও যন্ত্রণাবোধের সাথে মিথের সম্পর্ক অধিক।
৩. মিথ বর্তমানের সাথে অতীত চেতনার সেতুবন্ধ রচনা করে।
৪. মিথ ঈশ্বর ও দেব-দেবী সম্পর্কিত বিজ্ঞান পূর্ব ধারণার ব্যাখ্যা। ক্যাম্পবেলের মতে মানব জীবনের আত্মিক সম্ভাবনার সংকেত চাবি হলো মিথ।
৫. মিথ চরিত্রগুলো প্রতীকি। চলমান বাস্তবতার স্বরূপ উপলব্ধিতে মিথ আমাদের সাহায্য করে। সেই কারণে মিথের চরিত্রগুলো বিস্ময়ে,শক্তিতে, সৌন্দর্যে অলৌকিকত্ব ও চিরন্তনতা ( Divinity) প্রাপ্ত হয়।
৬. মিথগুলো স্বপ্ন বাস্তবতার রহস্য রূপ হবার সুবাদে অনায়াসেই অনন্ত সত্যের আঁধার হয়ে ওঠে এবং সময় বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়।
৭. আধুনিক বিজ্ঞান যেমন জীবন ও জগতের নানা জটিল বিষয়ের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত দিয়েছে,মিথগুলো তেমন যৌক্তিক প্রমাণসিদ্ধ বিষয় নয়। এর কারণ এগুলোর সাথে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
৮. মিথ যেহেতু মনশ্চেতনার বহিঃপ্রকাশ, সেহেতু মিথ চেতনা মানুষকে এক ধরণের মূল্যবোধে ভূষিত করে,আমাদের চৈতন্য ও বিবেকবোধকে সমৃদ্ধ করে এবং বস্তু ও বিষয়ের তাৎপর্যকে বহুদূর সম্প্রসারিত করে।
৯. মানুষের অভিজ্ঞতা মিথের ভেতর দিয়ে হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় পরিশ্রুত হয়ে আসে বিধায় মিথের সাহায্যে ব্যক্তিগত দুঃখ ও আনন্দবোধকে নৈব্যক্তিক রূপ দেওয়া সহজ হয়। মিথ তাই সার্বজনীন।
১০. মিথ মানুষের মনোজাগতিক বিজ্ঞান-বুদ্ধি ও কলাবিদ্যার যুগল সৃষ্টি।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks