হায়দ্রাবাদ, প্লেট, প্ল্যাটো আর পেট
সোমা দে
সোমা দে
হায়দ্রাবাদ আমি আগেও গিয়েছি। রামোজি, বিরিয়ানি, মুক্তো আর চারমিনারে ঝটিকা সফর আগেই সেরেছি। সে ২০০৯ সালের কথা। রামোজির নাক তখন উঁচু হয়নি, রাস্তায় যান তখন এতটা জট পাকায় নি, আকাশের বিস্তার তখনও অনন্ত, তখনও হায়দ্রাবাদ তেলেঙ্গানায় মেশে নি, অন্ধ্রের অন্দরে বিরাজিত ছিল। একদিনেই শহরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো সহজতর ছিল। হুসেইন সাগর লেক থেকে ভয়ানক গন্ধ তখন অনুভূত হতো না। গরমের হল্কা তখন হালকা ছিল।খাবারের দোকানের খবর লিমিটেড ছিল। এখনকার ইন্টারনেটে যে খাবারের খবরের ঝড়, তা তখন কোথায়!
২০২৬ সালে কালের নিয়মে অনেক কিছুই বদলেছে। ঘটনাচক্রে আমার বোধ, অনুভূতি, আবেগ ইত্যাদিও। আবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে বইয়ের থেকে বেশি এক্সট্রা তথ্য এবং জ্ঞানও। যেমন ২০০৯ এ হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানি খেয়েছি, অথচ ওসমানিয়া বিস্কুট মিস করেছি। রামোজি গিয়ে সময় নষ্ট করেছি, অথচ বিরাট ন্যাশনাল পার্ক যেখানে মন প্রাণ খুলে নিশ্বাস নেওয়া যায় বা ময়ূরের সঙ্গে হ্যাংআউট করা যায় অবলীলায়, তার খবর পাইনি, ভুল করেছি। এমনই কিছু প্রাণের আরাম, এই ২০২৬-এ যাতে হেলায় না হারাই, তাই যথেষ্ট সচেতন ছিলাম।
নানারকম বিরিয়ানি খেলাম, পাথরের ওপর রান্না করা অসাধারণ মাংসের প্রিপারেশন খেলাম, চারমিনারের সামনে গিয়ে ওসমানিয়া বিস্কুটের ছবি স্কেচ করেছিলাম অনেক আগে। এবার সেটা বাস্তবে করলাম। শুনলাম প্রায় ১৫০ ধরণের বিরিয়ানি পাওয়া যায় এই শহরে। আজকাল বাঙালিদের মধ্যেও বিরিয়ানির যে আকর্ষণ তাতে বাঙালির মাঝে মাঝেই এই শহরে টুকি মেরে যাওয়া উচিত। লাড় বাজারে গিয়ে মনে হলো এস্প্লানেডে এসেছি। সন্ধ্যায় অপূর্ব রূপ দেখলাম মিনারের মধ্যে দিয়ে। হুসেইন সাগর লেক থেকে নৌকা চড়লাম। রাস্তার দোকান থেকে ঝাড়বাতির তলায় পাঁচ তারা হোটেলে খাবারের স্বাদ পরখ করলাম। রমজানের সময় থাকার ফলে হালিমের স্বাদে আমি কুপোকাত হলাম। এ এক অসাধারণ বস্তু। জানলাম অন্য সময় নাকি হালিমের এরকম চারিদিকে সহজ যোগান থাকে না। ভেবে অবাক লাগলো, উৎসবের কারণে একটি বিশেষ খাবারের যোগান থাকে, এই বিষয়টিও নতুন করে জানলাম। আশ্চর্য বটে। দোকানে সেসময় লেখা ছিল," haleem is back". যেনো আমারই মনের কথা বলছে। I am back too. আপনারা কী জানেন, এই শহরটি হালিমের Geographical Indication (GI) status পেয়েছে। তবে চাই মজবুত পেট। মশলা এবং ঝাল দিতে এই শহর বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। ভরে দেয়, ভাসিয়ে দেয়। তারপর সেটি সামলানোর মতো পেটের জোর না থাকলে, খুব মুশকিল। পেটকে পোষ মানাতে হবে, যেন ও আপনার pet.
শহরের মধ্যেই আত্মীয়ের বাড়ির জানলা থেকে দেখা গেল ময়ূর। ওই কলকাতায় যেমন কাক, ঘুঘু বা কোকিল। কেমন লাগে বলুন তো?
আবার যেমন আমি বাংলার মিষ্টির ভ্যারাইটি আর কোয়ালিটি নিয়ে বরাবরই biased। আমার ধারণা ভারতবর্ষে কেন সমগ্র পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই যারা বাংলার মতো এতো রকম উপাদেয় এবং নানা প্রকারের মিষ্টি তৈরি করতে পারে। মানছি চিজ কেক আছে, অ্যাপল পাই আছে, মাইসোর পাক আছে, থাক। কিন্তু বাংলায় তো হাজার রকমের এমন মিষ্টি আছে, ওদের তো ওই একটা দুটো।হায়দ্রাবাদ গিয়ে জানলাম খুবানি কা মিঠা, বেশ কয়েক রকমের halwa, ডাবল কা মিঠা ইত্যাদি। এবং স্বাদ আহা আহা। শুধুই কী মিষ্টি। সঙ্গে রয়েছে বিস্কুট। বিস্কুটের ভক্ত না হলেও "ওসমানিয়া"র এক কামড়ে, ফ্যান হওয়ার গ্যারান্টি। কুতুব শাহ যিনি এই শহরের জনক, তিনি যে বিখ্যাত কবিও বটে, তাও জানলাম।
Urdu (Dakhini):
Mera shehr logaan se mamoor kar
Rakhya jyun tu darya mein min ya samei
English Translation:
"Fill my city with people as
You fill the river with fish, O Almighty."
আহা। হায়দ্রাবাদ শহরটি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত দাক্ষিণাত্য মালভূমি (Deccan Plateau)-এর উপর অবস্থিত হওয়ায় ফাঁকা সময়ে গাড়ি চালিয়ে দুরন্ত অনুভূতি হলো। এই উঠলাম, এই নামলাম, ওই আবার উঠলাম। মজার দিব্যি। বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো কখনও মালভূমি (Plateau) নিয়ে কোনও তথ্য রেখে গিয়েছেন কিনা কেউ কী জানেন? যাক!আর আমার পরিচিত মানুষদের থেকে জব্বর mehmaan nawazi পেলাম এই শহরে। এই শহরের বিশেষত্ব বুঝতে বুঝতে অনুধাবন করলাম, এই শহরের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব। পারস্য প্রভাব। আরাবিয়ান খাবারের আয়োজন আমাদের দেশে সবথেকে বেশি বোধহয় এই শহরেই। Arabian Mandi. বিরাট থালায় প্রচুর খাবার দেওয়া এবং তাতে একসঙ্গে অনেক মানুষের একসঙ্গে খাওয়ার যে রীতি, তাও জানলাম এখানেই। এটি plate নয়, platter. একটা মজার ঘটনা হলো, এই শহরে এসে ইন্টারনেটে যখন এই শহরের বেস্ট খাবারগুলোর নাম সর্ট করছি, তখন যখন আরাবিয়ান লিস্টে kunafe দেখলাম, মনে হলো এটা আমার খাওয়া দরকার। কিছুতেই সুযোগ হচ্ছিল না ব্যস্ততার মাঝে। তবে মাথায় ছিলো। হয়তো cheese kunafe নাম দেখে এতো লোভ লেগেছিল। একদিন সকালে ল্যাপটপে বসে কয়েকটা পুরোনো ছবি এমনিই browse করছিলাম। অন্যমনস্ক হয়ে। তারপরই মনে পড়ল kunafe খেতে হবে। সুযোগ ছিল। অর্ডার করে হাজির করানো গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত বস্তুটি। প্রথম কামড়েই মনে হলো, এ জিনিস রোজই কেন মেনুতে থাকে না। এরকম জিনিস কলকাতার অলিতে গলিতে কেন মেলে না। সেই অপূর্ব অনুভূতি ও আবেগে বইতে বইতে ল্যাপটপে খোলা ছবিগুলোর দেখে তাকালাম। আর আরও মন দিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি পুরোনো ছবিগুলো আমার প্রায় ১৫ বছর আগের turkey ট্রিপের আর সেই ট্রিপে আমি সুন্দর মারমারা সমুদ্রের ধারে বসে kunafeh খেয়েছিলাম। কিছুক্ষণ নিজেই অবাক হয়ে থমকে গেলাম। Kunafeh এর প্রতি লোভ তাহলে cheese এর কারণেই শুধু নয়। ১৫ বছরের একটা সুপ্ত অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে আমার আর kunafeh এর মধ্যে হয়তো! অদ্ভুত। একেই কী বলে টেলিপ্যাথি?! জানি না। তবে আমার হায়দ্রাবাদের স্মৃতিতে এ জায়গা করে নিল বটেই।
মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে যখন এতো কিছু জানছি সেসময়ই সেখানে চলছে যুদ্ধ। এই ঘটনা ২০২৬ সালের। এতো দারুণ খাওয়া দাওয়া আর শহরের বিশেষত্ব অনুভব করতে করতে খবরের কাগজ আর নিউজ চ্যানেলে যখন ভেসে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খবর, মন মুচড়ে ওঠে। বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। রমজানের সময় যাওয়ার ফলে, একদিকে যেমন সবাইকে সেজেগুজে আনন্দে মজে থাকতে দেখলাম। অদ্ভুত মন ভালো করা দৃশ্য। অন্যদিকে অন্যপ্রান্তে যুদ্ধের খবর। একবার এমনই এক যুদ্ধের মধ্যে (রাশিয়া - ইউক্রেন) কোনোরকমে বেঁচে ফিরেছিলাম আমি। তাই মন গুপী বাঘার মতো বলে ওঠে,
"মিথ্যে অস্ত্র-শস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে?
রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বে অমঙ্গল
ওরে রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বে অমঙ্গল
তোরা যুদ্ধ করে করবি কী, তা বল।"
আরো পড়ুন...
সিকান্দার কবিরের কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদ্দীন এর কবিতা পড়ুন এখানে
আমিনুল ইসলামের কবিতা পড়ুন এখানে
জিল্লুর রহমান শুভ্র'র কবিতা পড়ুন
রেজাউদ্দিন স্টালিন এর কবিতা পড়ুন
শামসুর রাহমানের গদ্য পড়ুন
নয়ন আহমেদ এর কবিতা পড়ুন
ভাস্কর চৌধুরীর কবিতা পড়ুন
নববর্ষের গল্পগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের ছড়াগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের গদ্য পড়ুন এখানে
নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা পড়ুন এখানে
স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা।।২৬ ছড়া পর্ব এখানে পড়ুন
ঈদ সংখ্যা।।২৬ প্রবন্ধ পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ গল্প পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ কবিতা পর্ব পড়ুন একানে
অনন্ত পৃথ্বীরাজ এর রোমান্টিক কবিতা পড়ুন
একুশের একগুচ্ছ কবিতা পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks