Top News

ফিরে আসার সামান্য ভঙ্গি ও অন্যান্য কবিতা। আর এম কারিমুল্লাহ।। firey asar samanno vongi কুয়াশা

   


    পুনরাবৃত্তি


বিকেল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দেয়ালের গা বেয়ে।
তবু জানালার পাশে রাখা গাছটা
অল্প আলো পেলেই নতুন পাতার কথা ভাবে।

এই পৃথিবীতে টিকে থাকারও আলাদা পরিশ্রম আছে—
কেউ চুপচাপ বহন করে,
কেউ আবার হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে।

পুরোনো ড্রয়ার খুললে কিছু চিঠি উড়ে পড়ে মেঝেতে,
কিছু অসমাপ্ত দিন ধুলো মাখা কাপড়ের মতো
ভাঁজ হয়ে পড়ে থাকে এখনও।

মাঝে মাঝে ভাবি—
মানুষ আসলে কত ভাষায় নিজেকে অনুবাদ করে বাঁচে!

রাতে দূরের ট্রেন গেলে ঘুম ভেঙে যায় পাখিদের,
আর নদীর নিচে অদৃশ্য মাছেরা হয়তো তখনও জলের ভিতর
নিজেদের ক্ষুধা ও ভয় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

তবু সকাল হলে কেউ না কেউ আবার দরজা খোলে,
চা বসায়, রোদে শুকোতে দেয় ভেজা কাপড়।

সম্ভবত বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ
এই ছোট ছোট পুনরাবৃত্তিগুলোই।


অবশিষ্ট পৃথিবী


পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মাটি বুঝে নেয় মানুষের ওজন—
কে কতদিন ধরে অভাব বয়ে নিয়ে হাঁটছে।
ধুলো, ঘাম, অর্ধেক খাওয়া দুপুরের ক্লান্তি
মিশে থাকে শরীরের গন্ধে।

চারপাশের মানুষগুলো দেখতে খুব স্বাভাবিক,
কিন্তু ভিতরে ভিতরে কত ভাঙা সিঁড়ি বয়ে বেড়ায় তা কেউ জানে না।

রাতে খবরের কাগজে নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি ছাপা হয়,
সকালে সেই কাগজেই মুড়ে দেওয়া হয় বাজারের সবজি।

তবু আশ্চর্য—
একটি শিশু এখনও ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াতে শেখে,
একটি গাছ পোড়া মাটির ভিতর থেকেও
পাতা বের করার চেষ্টা করে।

মানুষের শরীর বদলায়, মুখ বদলায়,
কণ্ঠস্বরেও ধুলো পড়ে একসময়, তবু ভিতরে কোথাও
একটা ছোট্ট স্পন্দন রয়ে যায়—
যা এখনও বিশ্বাস করতে চায় ভালো দিন বলে কিছু আছে।

অনেক সরকার আসে যায়,
অনেক পতাকা উড়ে যায় বাতাসে,
কিন্তু ভাঙা সংসারের শব্দ কোনো মঞ্চের ভাষণে শোনা যায় না।

তারপরও মানুষ প্রতিদিন ঘর বানায়,
ভাত রাঁধে, শিশুর কপালে হাত রাখে,
এবং পুরোনো ক্ষতের ভিতর থেকেই আবার বেঁচে ওঠার চেষ্টা করে।


ফিরে আসার সামান্য ভঙ্গি


যখন কোনো মৃত মানুষের হাসির সঙ্গে হঠাৎ মিলে যায়
এক জীবিত মানুষের ঠোঁটের কোণ,
অথবা হাঁটার সময় কাঁধ একটু কেঁপে ওঠে ঠিক আগের মতো,
তখন ধীরে ধীরে একটি পুরোনো জীবন
আবার লেখা শুরু হয়।

প্রথমে কেউ খেয়াল করে না। শুধু মনে হয়—
এই চোখদুটো কোথায় যেন দেখেছি,
এই চুপ করে থাকার ভঙ্গিটা কার মতো যেন।

তারপর একে একে ফিরে আসে পুরোনো ডাকনাম,
অকারণে হেসে ওঠার অভ্যাস, চায়ের কাপ ধরার ভঙ্গি,
এমনকি রাগ চেপে রাখার নীরবতাও।

গল্প যত এগোয় বাড়ির পুরোনো মানুষগুলো
চুপচাপ হয়ে যায় আরও, কারও চোখ ভিজে ওঠে,
কারও মুখে জমে থাকে অদ্ভুত এক ভয়—

মৃত মানুষরা কি সত্যিই চলে যায়?
নাকি তারা অল্প অল্প করে বেঁচে থাকে
অন্য কারও শরীরের ভিতর,
অন্য কারও দৈনন্দিন আলোছায়ায়?

এভাবেই কখনও একটি ভঙ্গি, কখনও একটি স্বর,
কখনও সামান্য মাথা নিচু করা—
হঠাৎ ছুঁয়ে দিলে মৃত মানুষরা আবার
ঘরের ভিতর হাঁটতে শুরু করে।


অপরাহ্ন


ধরা যাক,
একদিন সমস্ত আলো নিভে গেলে
আমি তোমাকে আর কোনো নামেই ডাকলাম না—
তবু কি চিনে নেবে আমার নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে?

যদি হঠাৎ কোনো শীতের রাতে পুরোনো শহর ভেঙে পড়ে কুয়াশার নিচে,
রাস্তা হারিয়ে ফেলে নিজের মানচিত্র,
তখনও কি পাশাপাশি হাঁটার কথা ভাববে?

আমরা তো কখনও অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির দিকে যাইনি,
কোনো নাটকীয় প্রেমও নয়—
শুধু মাঝেমধ্যে তোমার চোখে ভেসে উঠত একটু দীর্ঘ বিকেলের মতো মায়া।

জানি, সব ভালোবাসার আলাদা ভাষা থাকে না।
কিছু ভালোবাসা শুধু দূর থেকে টের পাওয়া যায়—
যেমন গভীর রাতে অচেনা কোনো ফুলের গন্ধ
হঠাৎ জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়।

তবু যদি কোনোদিন আমার ক্লান্তি তোমার ঘুমে ঢুকে পড়ে,
আমার দুঃখ তোমার শরীরে অকারণে হালকা কাঁপন তোলে,
তবে বুঝব—
পৃথিবীর দূরতম দুই প্রান্তেও মানুষ একে অপরকে
নিঃশব্দে বহন করে নিয়ে যেতে পারে।

আর তখন সমস্ত রাতই হয়ে উঠবে একটি দীর্ঘ জেগে থাকা—
যেখানে কেউ কাউকে ছুঁয়ে নয়, তবু গভীরভাবে পাশে থাকে।


শব্দেরা যেখানে আশ্রয় নেয়


সারাদিন এত শব্দ আসে—
কোনটা মানুষের, কোনটা বাতাসের বোঝা যায় না আর।

কেউ যেন দূরে টিনের চালের ওপর আঙুল ঠুকছে,
কেউ ভাঙা কলসির ভেতর জল রেখে ভুলে গেছে বহুদিন।

এসব ছোট ছোট আওয়াজ নিয়ে
আমার ভেতর একটা সন্ধ্যা তৈরি হয়—
সেখানে চায়ের কাপে চামচ নেড়ে যাওয়ার শব্দ,
ভেজা উঠোনে চড়ুই নেমে আসার শব্দ,
বইয়ের পাতার ভেতর শুকিয়ে থাকা ফুলের শব্দ,
আর রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব শব্দ।

আমি শুনতে পাই—
মায়ের পুরোনো শাড়ি আলনায় দুলছে,
বাবা দূরে কোথাও নিঃশব্দে কাশি চেপে রাখছেন।

তারপর বৃষ্টি নামে। জানালার কাঁচ বেয়ে
জল নেমে আসে ধীর অক্ষরের মতো।

আমি হাঁটতে থাকি— রোদপথ, ধুলোপথ,
ঘাসের ভিতর নুয়ে থাকা শিশিরপথ পেরিয়ে।

দেখি, আমার দুটি ক্লান্ত পা
কখন যেন মানুষের নয়—
পরিযায়ী পাখির মতো অচেনা আকাশে উড়ে যাচ্ছে।


ভেজা শহরে


বৃষ্টি থেমে গেলে রাস্তা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়,
যেন শহর তার সমস্ত গোপন দাগ
এক মুহূর্তের জন্য খুলে রেখেছে।

হাঁটতে হাঁটতে দেখি—
কিছু নাম সাইনবোর্ড থেকে মুছে গেছে,
কিছু দরজার সামনে পড়ে আছে ভেজা তালার গন্ধ।

পুরোনো ব্রিজগুলো এখনও অন্ধকারে জেগে থাকে,
পোড়া কাঠের মতো,
তাদের নিচ দিয়ে কাদা আর স্মৃতি বয়ে যায় ধীরে।

দূরের বাতির নিচে কুকুরগুলো গোল হয়ে শুয়ে আছে,
হাওয়া এসে বারবার তাদের ঘুম ভেঙে দেয়।

একটা তারে শুকোতে দেওয়া শার্ট কেঁপে উঠলে বুঝি—
মানুষ না থাকলেও
তার অনুপস্থিতি থেকে যায়।

রাত বাড়ে। চায়ের দোকান বন্ধ হয় একে একে,
তবু কোথাও ভাতের গন্ধ ভেসে আসে ক্ষীণভাবে।

তখন মনে হয়—
অভাবেরও নিজস্ব আকাশ আছে,
যেখানে খালি পেটেও জামাকাপড় উড়ে যায়
একটা ছোট স্বাধীন দেশের পতাকার মতো।



সুতো দেখা যায় কি না


হাঁটতে হাঁটতে
পায়ের শব্দ গুনে রাখা
আসলে খুব অদ্ভুত কাজ নয়।

কারণ অনেক সম্পর্কই
রাস্তার মতো—
শেষ কোথায় বোঝা যায় না সহজে।

আমি মাঝে মাঝে
চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে দেখি—
এক কাপ ধোঁয়া ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে,
যেন কেউ আসবে বলে
বিকেলটা অপেক্ষা করে আছে সেখানে।

কিছু কথা আছে
যেগুলো বলার পরও
হাওয়ায় ঝুলে থাকে অনেকক্ষণ,
ছেঁড়া ঘুড়ির সুতো যেমন
বিদ্যুতের তারে আটকে থাকে।

আমি ভাবি—
মানুষ কি সত্যিই একজনের ভিতর আরেকজনকে রেখে যায়?
নাকি সবই শিমুল তুলোর মতো
এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে
উড়ে যাওয়া সামান্য দুঃখ?

রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখি—
রাস্তার আলো পায়ের কাছে পড়ে আছে,
আর আমার ছায়া
বারবার লম্বা হয়ে
অচেনা কোনো দরজায় কড়া নাড়ে।


ক্ষুধার কোণগুলো


ভুলে যাওয়ারও নিজস্ব হিসেব আছে—
কখন কোন মুখ মুছে যাবে
তা কেউ জানে না আগে থেকে।

কিছু স্মৃতি ত্রিভুজের মতো দাঁড়িয়ে থাকে—
এক কোণে ক্ষুধা,
এক কোণে মানুষ,
আর অন্য কোণে অল্প একটু বেঁচে থাকার আলো।

আমি মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকি,
দেখি মাথার উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চলে যাচ্ছে,
তাদের ডানায় লেগে আছে দূর দেশের জ্বলন্ত বিকেল।

হাতের রেখায় জমে থাকা ভাতের দানা
কখনও খেয়েছি,
কখনও বাতাসে ছুড়ে দিয়েছি চুপচাপ।

তবু রোদ প্রতিদিন
একই সরলরেখায় এসে পড়ে উঠোনে,
আর খালি থালার পাশে বসে
একটা ক্ষীণ হাসি রয়ে যায়।

আমি জানি—
দানার ভিতর একটা ছোট্ট পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে,
সে-ই শুধু মনে রাখে
কোথায় আমি সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছিলাম,
আর কোথায় নিজের সমস্ত অভাব
উল্টে রেখে এসেছিলাম নীরবে।


ঘরছাড়াদের শব্দ


আমার খুব ইচ্ছে হয়
একদিন সবাই হঠাৎ এসে
আমার ফাঁকা উঠোনটা ভরে দিক কথাবার্তায়।

এমন ইচ্ছে
মানুষ কাউকে খুব একটা বলে না,
কারণ ভিড়ের মাঝেও অনেকের ভিতর আলাদা এক নির্জনতা থাকে।

কিছু কথা নদীর মতো দীর্ঘ—
তাদের একা বহন করা যায় না সহজে।
মাঝপথে তারা থামতে চায়, কারও বারান্দায় বসে একটু শ্বাস নিতে চায়।

কিন্তু এখন
মানুষ এখন দরজা বন্ধ করতে বেশি অভ্যস্ত, জায়গা করে দিতে নয়।

কেউ হয়তো শুধু কণ্ঠস্বর শুনেছে,
কেউ শুধু বিদায়ের শব্দ।
ঠিক যেমন শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পরও
অনেকক্ষণ কেঁপে থাকে প্ল্যাটফর্ম।

রাত নামলে দেখি
এক এক করে আলো নিভছে চারপাশে,
আর মানুষ তাড়াহুড়ো করে নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়ছে।

তখন মনে হয়—
যাদের সত্যিই ঘর আছে তারা কোনোদিন বুঝবে না
ঘরছাড়া মানুষের গান কত দূর থেকে ভেসে আসে।



ক্লোজড সেন্টেন্স


শব্দেরা পাখির মতোই উড়ে যায়—
ঘরের ভেতর থেকে বারান্দা,
বারান্দা পেরিয়ে
অচেনা পাহাড়ের দিকে।

তুমি তাদের ডাকোনি কখনও,
তবু গভীর রাতে দেখি একটি শব্দ
তোমার অসমাপ্ত বাক্যের ভিতর
এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে।

বৃষ্টি সারারাত পড়লে
পুরোনো খাতার পাতা যেমন ফুলে ওঠে,
আমাদের কয়েকটি দিনের স্মৃতিও
তেমন ভিজে ভারী হয়ে আছে এখনও।

পাতার পর পাতা
শুধু নির্জনতার হাতের লেখা,
মাঝে মাঝে দু-একটা শুকনো ফুলের দাগ
অথবা কালি ছড়িয়ে যাওয়া বিকেল।

আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে
শরীরের কিছু অংশ গাছ করে ফেলেছি—
হাতের ভিতর শেকড়,
পায়ের ভিতর ধুলো জমেছে বহুদিন।

এখন আকাশের দিকে তাকালেও
কোনো মেঘের নাম মনে পড়ে না,
শুধু দেখি সাজানো কথাগুলোর নিচে
মাটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে।


সূর্যেছোঁয়া শিশির


প্রথম অনুসন্ধানের অব্যক্ত শোক
জমাট মেঘের নীরব সংকেত
হৃদয়ের কান্নার নিষ্ফল প্রতিধ্বনি
ভাষা আর ভাবনার অদৃশ্য হিসেব-নিকেশ।

সৃষ্টিমেঘের দাউদাউ জ্বালা
আমি পুড়তে দেখেছি,
তবুও
ছায়া-আলোর স্বরচিহ্নে,
জোছনার আঁচলে তৃষ্ণা বুনে,
সুর হতে চাই।

জীবন-খেলার ফাঁকে
একটু উঁকি দিতে চাই,
বন্ধনে জড়িয়ে পড়তে চাই।
তোমার কুয়াশাছোঁয়া, রোদছোঁয়া,
ঝরে পড়া শিশিরবিন্দুর ভেতর।


আরো পড়ুন......

ঋজু রেজওয়ান এর দশটি কবিতা পড়ুন এখানে
নাহিদ হাসান রবিন এর গল্প পড়ুন এখানে ক্লিক করে
ইমদাদুল হক মিলনের নুরজাহান উপন্যাস নিয়ে প্রবন্ধঃ পড়ুন
চানক্য বাড়ৈ এর কবিতা পড়ুন এই লিংক এ
বিনয় মজুদারকে উৎসর্গিত পিয়াস মজিদের কবিতা পড়ুন এখানে
কবি আমিনুল ইসলাম মুল্যায়ন প্রবন্ধ পড়ুন এখানে 
ড. আলী রেজার প্রবন্ধ পড়ুন এখানে ক্লিক করে
মোহাম্মদ জসিমের ভিন্ন রঙের কবিতা পড়ুন এখানে
জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ভিন্ন স্বাদের কবিতা পড়ুন এখানে
ওপার বাংলার বিখ্যাত কবি রবীন বসুর কবিতা পড়ুন ক্লিক
ওপারের কবি তৈমুর খানের কবিতা পড়ুন এখানে

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন