অন্ধকারের বোতাম খুলে থেকে পাঁচটি কবিতা। five poems from andhokarer botam khule | কুয়াশা

আহম্মদ হোসেন বাবু কবি, আবৃত্তিকার ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৬ জুন ১৯৬১, দক্ষিণ দিনাজপুর, ভারত । মা: আমেনা বেগম , বাবা: মোঃ মহির উদ্দিন মণ্ডল। স্থায়ী নিবাস: নওগাঁর পত্নীতলার মামুদপুর গ্রাম। কবির "অন্ধকারের বোতাম খুলে" থেকে ৫টি কবিতা প্রকাশ করলো কুয়াশা।

| সস্পাদক



অন্ধকারের বোতাম খুলে।। আহম্মদ হোসেন বাবু



বাংলা আমার মাতৃভাষা 

বাংলা আমার মাতৃভাষা বাংলা আমার প্রাণ
বাংলা আমার বরকত সালাম বাংলা ফুলের ঘ্রাণ।
বাংলা আমার কৃষ্ণচূড়া, লালের মধ্যে লাল
বাংলা আমার হিজল তমাল নৌকায় তোলা পাল।

বাংলা আমাদের প্রথম দাবি প্রথম চিৎকার 
রক্তমাখা আসাদের শার্ট শপথ অঙ্গীকার।
বাংলা আমার মুখের ভাষা সমুদ্রের গর্জন
ভাষার জন্যে জীবন দিয়ে করেছি অর্জন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার পেলাম স্বীকৃতি
শোষণের বেড়াজাল থেকে পাইনি নিষ্কৃতি।
বাংলা এখন ভারতবর্ষের ধ্রুপদী ভাষা
তাই দেখে জুড়ায় পরান মনে জাগে আশা।

আফ্রিকার একটি দেশ নাম তার সিয়েরা লিওন
বাংলা লেখার ঠিকানায় ছুটছে জোরে পিয়ন। 
বাংলার জন্যে হয়ে হন্যে, শিলচরের মানুষ
কত প্রাণ বলিদান সরকারের নেই কোন হুশ।

প্রথম নারী ভাষা শহিদ কমলা তাঁর নাম
পৃথিবীর সকল মানুষ জানায় তাঁকে প্রণাম। 
যেখানেই যাও, থাকো যে কোন ভাষার কাছে
জিহবায় মাতৃভাষা সর্বদা যেন নাচে।

আমার মাতৃভাষা, আমার ভালোবাসার ধন
সে ভাষাতেই সকাল-সন্ধ্যা আটকে থাকে মন।



উত্তরাধুনিক কাজী নজরুল 


চুরুলিয়ায় জন্ম বাংলাদেশে মৃত্যু
কবি কাজী নজরুল
দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি সে
বাংলায় ফোটা এক ফুল।

তোমার কবিতা ও গানে জেগে ওঠে
প্রগাঢ় অভিমান
শত অভাব অনটন করেছে মহান
তুমিই বাংলার সম্মান।

বাংলা, উর্দু, ফার্সি ভাষার ভুবনখ্যাত
অহংকারের এক নাম
"মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই" বলেন-
কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রেম, দ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা
মানবতার উজ্জ্বল ছবি
লেটো গান, রুটির দোকান পেরিয়ে তুমি
আজ জাতীয় কবি!

তোমার গল্পে, উপন্যাসে জীবনদর্শন
আজও খুব প্রাসঙ্গিক
তোমার সুরে শেকল ভাঙার গাই গান, তাই-
তুমি উত্তরাধুনিক।

তুমি জেল, জুলুম, হুলিয়া হাসিমুখে
করেছিলে বরণ
লাল-সবুজের পতাকা তোমাকে শ্রদ্ধার
সাথে করে স্মরণ।।


অন্ধকারের বোতাম খুলে


নিশ্চিত যাবোতো, এই শেষ নয়-
আবারও একদিন দেখা হবে আমাদের।
প্রেম থাকলে আসতে হয়, ভালোবাসা থাকলে ফিরতে হয়।
ফিরলে, ফুল হয়ে ফিরবো।
পূর্ণিমার রাতে জানালার পাশে, হাস্নুহেনা
যেভাবে বিলায় গন্ধ- ঠিক সেভাবে।
নয়তো ছোট্ট পাখি হয়ে কিংবা আকাশের মেঘ হয়ে-
যেন আশা-যাওয়ার মাঝে না থাকে বিলম্ব কোনো।
নয়তো ফিরবো আকাশের তারা হয়ে-
দেখা যাবে, কিন্তু হাত বাড়িয়ে যাবেনা ছোঁয়া।
তবে আমরা ছোঁবো মন দিয়ে মন, কথা দিয়ে কথা-
যে কথা বলিনি, যে গান এখনো গাইনি
সে কথা সে গান দিয়েই কাটবে মধুচন্দ্রিমার মাধবী প্রহর;
আমাদের হাসির ঝংকারে নক্ষত্র সাজাবে আলোর বাসর।

যাব তো নিশ্চিত, আবারও দেখা হবে আমাদের
তখন শুধুই পলকহীন চেয়ে থাকা।
বিদ্যুৎবাহী তারে হঠাৎ যেভাবে জ্বলে ওঠে আলো-
ঠিক সেভাবেই জ্বলবে আমাদের  অক্ষিতারা,
মধুপূর্ণিমার চাঁদ বিছাবে নরম আলো, আমাদের নিমগ্ন নগ্নতায়-
নেশাধরা মহুয়ার গন্ধে জ্বর বইবে শরীরে তখন,
চৈতিরাতে ডানা ঝাপটাবে রাত জাগা পাখি;
ঢাক বাজবে ঢোল বাজবে, বাজবে নগ্ন পায়ের নুপুর।

কখনো বলিনি আসবো না , আসবো তো নিশ্চিত।
প্রেম থাকলে আসতে হয়, ভালোবাসা থাকলে ফিরতে হয়।
অন্ধকারের বোতাম খুলে, কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে-
গড়াতে গড়াতে ফিরবো শীতল পাটির বিছানায়।
তুমি দেখে নিও, আবারও একদিন দেখা হবে আমাদের।।


হেমন্তরাতের তারা


রক্তাক্ত শহরে হেমন্তরাতের তারা জেগেছে স্লোগানে
মফস্বলের নদীটি এখন ভাঙন আগ্রাসী
হেমন্তের বাতাসে কালাগ্নি হু-হু করে জ্বলে
ইস্পাত-কাঠিন্যে শ্রমিকের উত্তোলিত মুষ্টিবদ্ধ হাত রুখে দিতে-
থেকে থেকে বেজে ওঠে অভ্রভেদী বিকট হুইসেল!
চারিদিকে হুলাহুলি, কালিদহে আটকে আছে কালান্তর।

জাফরান রঙের বিকেলে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে
মহাতোলপাড় রাস্তার মোড়ে মোড়ে
সংঘবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় মানুষ ডানায় ভর করে উড়তে থাকে
স্লোগানের গলা কাটতে দৌড়ে আসে হায়েনার দল
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধার শরীর
সারি সারি লাশের স্তূপের উপরে দাঁড়িয়ে
হেমন্তের মাঠে সোনালি ধান খেত মাড়িয়ে
জলপাই রঙের গাড়ি থেকে গুলি হতে থাকে
হুড়মুড় করে পড়ে যেতে থাকে হেমন্তের কালশশী!

হঠাৎ চমক লাগে শুকনো মুখে, চোখের তারায় বিদ্যুৎ খেলে যায়
কাফনের কাপড় শরীরে জড়িয়ে এ কী আত্মাহুতি!
দু'উরুর মধ্যখানে অশ্বশক্তির খীপ্রতা বাড়ে
হাতের-পায়ের আঙলগুলো যেন রাইফেলের বেয়োনেট!
কামলা-কিষেণ হাতের কোদাল, দা-খুরপি ফেলে-
ভাঙা দেহ তুলে স্থির দাঁড়িয়ে পতাকা হাতে নিয়ে-
বিষণ্ন অপুষ্টি ভরা মুখে টাটকা বিজয়ের গান ধরে!
শিরদাঁড়া বেয়ে তির-তির করে উঠে আসে অভ্যুদয়!
মাথার খুলির নিচে মগজের ভেতরে ঝা-ঝা-ঝিন-ঝিন শব্দে
ধুলোময় রুক্ষ চোখে-মুখে লাল সবুজের গানে
ফুটন্ত শরীরে ফোঁস-ফোঁস শ্বাসে বিজয়োল্লাসে
ফিনিক্স পাখির মতো ছুটে আসে হেমন্তের হিমে আগুনের ফুলকি!
জানালার পর্দা ভেদ করে ছুটে আসে লকডাউন শাটডাউন
মিছিলের পুরোভাগে মুষলধারে পুষ্পবৃষ্টি চলে অবিরাম
বৃষ্টিস্নাত বাংলাদেশে জেগে ওঠে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার,
ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে সিংহনাদে জেগে ওঠে ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত  প্রজন্মের পদভারে
জেগে ওঠে বরকত সালাম...
জেগে ওঠে নীল আসমান, জেগে ওঠে বাংলা অভিধান
জেগে উঠে সর্বহারা, জেগে ওঠে হেমন্তরাতের তারা।

 
অমৃতের সন্তানেরা জাগো


(উৎসর্গ- ১১ আগস্ট ১৯০৮ ক্ষুদিরাম বসু'র ফাঁসির দিন।  বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী স্মরণে)


আর কতবার ইংলিশ চ্যানেল পার হলে আমাকে সাঁতারু বলবে?
আর কতখানি পথ পাড়ি দিলে তুমি আমাকে পথিক বলবে?
আর কয়টা বুলেট শরীরে বিঁধলে তুমি আমাকে বিপ্লবী বলবে?
দানবিক এ স্বদেশে, নিজের লড়াইয়ে রক্তাক্ত প্রতিনিয়ত।
যেহেতু অশিক্ষা, মূঢ়তা, স্বার্থপরতা, গ্রাস করছে আমাদের
ব্যর্থতার গ্লানি ঢেকে দিচ্ছে বিজয়গাঁথা ইতিহাস-
সেহেতু সকল প্রতিকূলতার নদী তোমাকেই পার হতে হবে;
সময়ের সাথে সাথে গা ভাসাবে, না ঘুরে দাঁড়াবে-
সে বোঝাপড়ার স্বর্ণালি সময় সামনে তোমার।
চারিদিকে আজ গাঢ় অন্ধকার-
দূরে, বহু দূরে, মিটিমিটি করে জ্বলে ক্ষীণ একটি আলো
তবুও মানুষ, সেই ক্ষীণ আলোর উপরে আস্থা রাখে।
মানুষের জ্ঞানশক্তি, প্রাণশক্তি, আলোর মিছিলে হাঁটে
সাগরতরঙ্গের মতো আশাবাদী মানুষেরা, স্বর্ণচূড়া  স্পর্শ করে।

পৃথিবী যেমন সমতল নয়, মানুষও তেমনি
মানুষ তখনো মানুষকে বোঝেনি- আজও নয়,
শরীরে বুলেট  লাগবে, রক্ত ঝরবে, মরবে, তবু-
নিজের লড়াই নিজেকেই করতে হয়।
তোমার লড়াই তোমার আজন্ম অধিকার
তোমার সৌন্দর্য, নির্মাণ, তোমার স্বাধীকার।
অমৃতের সন্তানেরা জাগো, এখনো সময় আছে সামনে চলো...
আর কয়টা বুলেট শরীরে বিঁধলে, আমাকে বিপ্লবী বলবে বলো?
 

আরো পড়ুন....

কবি আমিনুল ইসলাম মুল্যায়ন প্রবন্ধ পড়ুন এখানে 
ড. আলী রেজার প্রবন্ধ পড়ুন এখানে ক্লিক করে
মোহাম্মদ জসিমের ভিন্ন রঙের কবিতা পড়ুন এখানে
জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ভিন্ন স্বাদের কবিতা পড়ুন এখানে
ওপার বাংলার বিখ্যাত কবি রবীন বসুর কবিতা পড়ুন ক্লিক
ওপারের কবি তৈমুর খানের কবিতা পড়ুন এখানে

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন