মামুন সুলতানের একগুচ্ছ কবিতা
ঝলসানো কণ্ঠ
রেগে থাকা দুপুরের মত তোমার রাগত মনে
তপ্ত হতে হতে আমি জ্বলে উঠি তোমার উনুনে
কদলি বনের ছায়া খুঁজে উড়ি না অন্য হাওয়ায়
আগুনের হল্কার উত্তাপে ঝলসে গেছে কণ্ঠনালি।
বিনয় চোখের তারা জলজ-আলোয় ভিজে রয়
শাদা কয়তরে ফিরে আসি নিরাময় তলে
যে খাঁচায় বাঁধি রাখো একুশের দাগ পড়া হাত
ইরেজারে মোছা যায় কি কপালের দাগ?
দুপুরের তপ্ত রাগ মেঘের আড়ালে গেলে
পোয়াতি বৃষ্টির গাই ক্ষণে ক্ষণে ধুয়ে দেয় মনের ক্ষত
প্রশান্তির টানাচোখে হয়ে উঠি প্রশান্ত বিকেল
তোমাকে অবুঝ ভেবে রাগগুলো ভাগ করে খাই
নতুন ঘাসের মত পূণজন্ম নেয় নব-উদ্যান
উদ্দীপ্ত জীবনে বুঝি ভাটা-জোয়ারের আদান প্রদান।
২
চোখের প্রশান্তি
চোখের সীমানা মেপে নিজের ক্ষমতা মাপি
যেখানে নুয়েছে নীল তার সীমা কতদূর
উড়ন্ত মেঘের সিঁড়ি কতদূর পাহাড়চূড়
রূপের রৌশন খুঁজে পাও কি রঙের ঝাঁপি?
চোখের দৃষ্টি কেবল অনুমানে দৃশ্যালাপ
তোমাকে সুন্দর বলি এইমাত্র দেখা রূপ
নূরের প্রলেপ জ্যোতি সীমা পেরুলেই চুপ
অদেখা অনেক কিছু করে বিরহ বিলাপ।
হৃদয়ের দেখা খা'ব এ-চোখে যায় কি দেখা
হৃদয়ের ভাবনা যত মূর্ত করে যায়কি আঁকা
চাঁদের অপর পৃষ্ঠে চোখ-বিমানের পাখা-
কখনো দেখেছে কেউ কী নাম সেখানে লেখা?
জ্ঞানী চোখ খুলে দ্যাখো রূপ অরূপের দৃশ্য
প্রশ্নের সব উত্তর পাবে না লৌকিক চোখে
অন্তরে অদৃশ্য জ্ঞান খুঁজে দ্যাখো লোকে লোকে
চোখের প্রশান্তি নিয়ে দেখে যাই মহাবিশ্ব।
৩
আমার বোদলেয়ার
আমি বোদলেয়ারের শহর খুঁজি পুস্তকের পাতায়
মা খুঁজে বেড়াচ্ছেন গ্রামে যাওয়ার পথ
মা মনে করেন চারদেয়ালে পোষা মনে
উঠানে বিছানো রোদ ধারণ করতে পারে না।
মোরগের ডাক আর হাঁসের প্যাঁওপ্যাঁও উচ্ছ্বাসে
মায়ের হার্টবিট ওঠে আর নামে
আশ্চর্য দুটিপথের মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে
শহরের গলিপথে মাকড়সার জালে আমি বিঁধে যাই
তখন মায়ের শাদা আঁচল খুঁজে পেরেশান হই
টাইকোট পড়া সময় লুঙ্গির প্যাচে মুখ লুকায়
গামচায় হাত মুছতে মুচতে মাকে চুমু খাই।
বোদলেয়ার
জার্মানির মিউনিখে আমার জন্য ফ্ল্যাট বানাও
মাকে বলেছি
তোমার সন্তান যাবে দ্রষ্টব্য ছাড়িয়ে আকাশ ছুঁতে
শাড়ি ঘোচাতে ঘোচাতে মা গ্রামের পথে
আমি বোদলেয়ারের প্রতিকী অন্বেষায়।
৪
বাউল-নদী
পথে পথে কাঁটাবন জঙ্গল মাড়িয়ে হাঁটি
সাধুরা সঙ্গীতে মাখে উচ্চাঙ্গ কষ্টাঙ্গ সুর
অষ্টধাতুর সেতারে বাজে রূপালি নুপুর
আধশোয়া জীবনে দেখি অর্ধমৃত সুরাবাটি।
বাউল বাড়ির পথে কেউ করো না শোরগোল
ধ্যানে বসেছে বিকেল অস্তগামী সৈকত
রঞ্জিত সুরের স্বাদ কাক-দোয়েল দ্বৈরথ
পোকা মাকড়ের গ্রামে ওড়ে আসে আরশোল।
বাউল তরঙে ছোটে নতজানু ছোট নদী
বিহঙ্গে বিলায় সুখ গ্রাসে প্রাণ বাজপাখি
সৃজনে বেদনা আছে সাধনায় রঙ মাখি
শকুনেরা হল্লা করে মঞ্চে মঞ্চে নিরবধি।
ছোট নদী বিকি হয় শুনি কুড়ি টাকা দামে
অপশক্তি বালু বেচে নদীকে করিয়া খুন
বাউল দুতারা হাতে করে উহাদের গুণ
সাধনা শুধায় রাতে কী করে বাঁচো এ-ধামে?
৫
অঙ্কনতীর্থ
তোমার শরীরে কতো নিগূঢ় রহস্য
কাঁঠাল ভাঙার মতো বৃষ্টি খুলে দেখি
ভিতরে জলের রঙে এঁকে যায় মেঘ
অকষ্মাৎ নদী হয়ে তোমাকে স্নাত করে।
ভিঞ্চির অঙ্কনতীর্থের সহজ-রহস্যে
তোমার দীঘল কেশ নিশিরঙ ছড়ানো আঁধার
তোমার আঙুলে নড়ে ওঠে সূর্যলাল তুলি
চোখের কাজল থেকে বেরিয়ে আসে অরণ্য।
তোমার ঘন রহস্যে আমি ডিনামাইট বালক
শাড়ির কুঞ্চনে খুঁজি হিমালয়ে ওঠার সিঁড়ি
পাহাড় চূড়ার প্রাণ ফলবতী বৃক্ষের স্বরূপ
ঘন অরণ্যের মত ঘনীভূত হও মনে মনে।
শত রহস্যে কীভাবে নরমাল রাখো জীবন
অনুরাগে অবিকল মানব-হৃদয় তোমার
শিল্পীর মতো মহলে এঁকে রাখো প্রোট্রেট
জীবনে জীবন আঁকো প্রেমময় সংসারে।
৬
প্রেমের তিরাশ
প্রেমের তিরাশে মনে হয় শুকিয়ে যাবে সাগর
মনের বেদনা ঘাই মারে নদীর গভীরে
সকাতর শূন্যতায় বারবার শুকিয়ে যায় বন
পাণ্ডুর প্রস্তরে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে অদ্ভুত-সিপাহি
প্রেক্ষিত-সুখ কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না
নিক্তির ওজনে সুখ দত্তক হয়ে চলে যায়
মনের প্রাচীর ঘিরে তখন শ্যাওলা জমে
দুঃখজমিনে তখন মেঘেরা কালো হয়ে ঝরে
মাটির পিদিম তলে জমে কালো অন্ধকার
আনারসের চোখের মত অসুখের অশরীরী দাগে
অসুখে ভরাট হয় ভাবনার ক্যানভাস
সকল শূন্যতা আর মনের তিরাস দূর হয়
প্রেমের মিঠাই-জলে কেবল হাস্যময় তোমাকে ঘিরে
ফুল ফোটার সকালে নিরাই-ভোরে
মৃত্তিকার ভেজা দেহে গন্ধ ভাসে আজন্ম সুখের
তৃষিত মনে তখন বয়ে যায় অবারিত সবুজধারা
বৃষ্টি বরিষণে মিটে যায় যাবতীয় প্রেমের তিরাশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks