সু শা ন্ত হা ল দা র এর কবিতা।। poems by sushanto halder কুয়াশা

  


 সু শা ন্ত  হা ল দা র এর কবিতা

কতকিছুই তো ভেবেছিলাম 

কতকিছুই তো ভেবেছিলাম 
তোমার গন্তব্যে এসে দেখি
কে যেন রেখে গেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মুঠোমুঠো সর্বনাশ

দূরে, নদীর কল্লোল বিমোহিত বনবীথি গ্রাম 
যেখানে লাল নিশানায় লিখে এসেছি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নাম,
তুমি যাবে বলে 
যুদ্ধের সব সাজসজ্জা ফেলে এসেছি আর্য ঘোষিত মুকুন্দ গ্রাম 
অথচ চৈত্র খরায় পুড়ে যাওয়া বাংলায় আইভান দ্য টেরিবল দেখে গেলাম 

কতকিছুই তো ভেবেছিলাম 
বর্ষার এই বৃষ্টিমুখর দিনে তুমি যদি থাকতে 
বেনারশী শাড়ি পরিয়ে সিরাজের লুৎফুন্নেসা করে রাখতাম!  


যদি প্রেম দাও (২)
‎যদি প্রেম দাও 
‎নিজেকে ভেঙেচুরে গড়ে তুলবো জাজ্বল্যমান যুধিষ্ঠি সমান, 
‎ভয় পেও না 
‎বর্ষার হিমেল বৃষ্টিতে সাজাবো না তোমার কাঁচুলি পরা শ্বেতশুভ্র স্তন 
‎যুঁই কিংবা বকুল যদি ভালো লাগে তোমার 
‎ভীম গর্জনে আমিও তুলে আনবো
‎দেবদেবর্ষীর মতো মধুকৈটব ভৈরবে সমুদ্র-মন্থন 
‎তখন যদি ঊর্মির মতো ঝঞ্ঝা প্রবল হতে চাও 
‎অনল দগ্ধ আগুনে বিদ্ধ হবে তোমার কামরূপ কামাখ্যা পরিসর 
‎যদি প্রেম দাও 
‎তুচ্ছ করি সাড়ে সাত কোটি শিমুলের সুখ সাচ্ছন্দ্য অবসর,  
‎ভয় পেও না 
‎বেহুলা ক্রন্দনে কেউ আর কুম্ভকর্ণ নিদ্রা যাবে না এখানে 
‎ঘাসফুল লাঞ্ছিত ঝঞ্ঝা প্রবল দিনে 
‎বরুণা-বুক যদি ভরে উঠে গন্ধবিধুর বসন্ত আগুনে 
‎আমাকে পাবে চিরহরিৎ বাংলার কোন অমিয় সুধীন্দ্র বহরে!  

পরিত্যক্ত সব পড়ে আছে অমরত্ব সমাধি করে 

আমরা, আমাদের বাড়ি ভুলে গেছি, 
জানালার ওপাশটায়
যেখানে বৃষ্টিতে ভিজে থাকতো
বর্ষার মালতী ঘেরা গন্ধ বকুল যুঁই চামেলি কিংবা বনফুল শেফালী 
এদিকটায়.....
যেখানে সারমেয় ব্রুনো বাঁধা থাকে বারান্দায় 
তারই সামনে বাবা ঘুমায় চিরনিদ্রায় 
তারই হাত পাঁচ সামনে নারকেল গাছটা বেড়ে উঠলো অবলীলায় 
অথচ বাবার নাতিদীর্ঘ পথটা ভুলে গেছি অকৃতজ্ঞতায়
যেখানে এখন বৃষ্টিতে বর্ষা নামে হামাগুড়ি কাদায়, 
এমনই দিনে শ্রাবণের কথা খুব মনে পড়ে 
চৈত্রের দমকা এলেই দৌড়ে পালাতো ভাদ্রমুখর আশ্বিনে 
বৃষ্টিভেজা কদম জানতোই না 
বৈশাখ তার তাণ্ডব চালাবে ক্ষ্যাপাটে চৈত্রের ফাল্গুনে 

আমরা কি আমাদের পথ ভুলে গেছি কদম ভাসা বর্ষার জলে? 
নাকি ডুবোচাঁদ জোছনার মিহি ছায়াতলে 
যে নক্ষত্র জেগে আছে জীবনানন্দ বাসর করে
তারই আলোকোজ্জ্বল ছায়াপথ ধরে হেঁটে যাব সূর্য্য-অস্ত গোধুলিয়ার দিকে,
যেখানে ধূধূ মাঠ পরিত্যক্ত পড়ে আছে অবিনাশী সব অমরত্ব সমাধি করে!  

অলৌকিক এভাবেই ঘটে 

যদি অলৌকিক কিছু ঘটে যায়, 
রাত্রির দ্বিপ্রহরে উঠে দেখলেন 
শিয়রে দাঁড়িয়ে রবার্ট ক্লাইভ উমিচাঁদ রায় বল্লভ ঘসেটি,
চিৎকার করবেন নাকি ধীর শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করবেন - 
এ চক্রান্তের কারণ কি? 
যদি দেখেন
দূরে দাঁড়িয়ে সিরাজ
হতাশার জানালায় মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে অতি সুক্ষ্ণ কৌশলে 
মীর জাফর আলী খানের নির্লজ্জতায় মীরনের লাম্পট্য বেড়েছে দ্বিগুণ 'গোপনে'
তাহলে বুঝবেন 
আততায়ী আপনারই ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে সোহাগী-পল্লীতে

যদি অলৌকিক কিছু ঘটে যায়
প্রাতরাশ সেরেই দেখলেন 
দুনিয়ার তামাম আরশোলা আপনারই টেবিলে 
পাশেই টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে 
বিপ্লবী নেতা চে' মারা গেছে বলিভিয়া যুদ্ধে 
অথচ আপনার স্ত্রী ফিসফিস করে বলছে
সে নাকি হো-চি-মিন কে দেখেছে আলফাডাঙ্গার ভূমিহীন অফিসে,
অলৌকিক এভাবেই ঘটে 
যখন আমার হিস্যার চাতালে ভিনদেশী শকুন বসেছে হাত পা ছড়িয়ে 'গোপনে'!  


ছটাক খানেক জীবনে 

তোমাকে পাই বা না পাই 
মৌসুমি বর্ষার ত্রিফলা বুক চিরে 
ভাসাব নাও সেন্ট মার্টিন দক্ষিণে 
যেখানে থেমে গেছে জীবন অসংখ্যবার হাবিয়া সাক্ষাতে 

ছটাক খানেক জীবনে 
যদি পূর্ব ঘোষিত ছাড়াই নেমে আসে বিদ্রুপ অসংখ্য পেরেকে 
যদি প্যারাসাইট জীবনে ভরে উঠে বুক সাইনোসাইটিক ভেজালে 
তবে কবিতার অলিগলি পেরিয়ে
চলে যাব তোমাদের ওই জলাতঙ্ক শহরে 
যেখানে অক্ষর বৃত্তের বলয়ে মরেছিল সুলতানও ব্রংকাইটিস আতঙ্কে 

যদি ছটাক খানেক জীবনে 
তোমাকে পাই বা না পাই 
মাটিভেজা গন্ধ শুঁকেশুঁকে
চলে যাব বসন্ত ঘেরা চৈত্র তাপিত হেরা-মন্দিরে 
যেখানে তুমি ছাড়া সব তুচ্ছ এই জীবনানন্দ বসতে!


তুমি নাই বলে 

তুমি নাই বলে 
হকার শূন্য শহরে
হুহু করা বাতাস সটান শুয়ে আছে একাকী রাজকীয় প্রাসাদে 
রাজবর্গ সব যে যেখানে ছিল প্রভূত হিসাবনিকাশে 
তারা সব অলস ঘুমিয়ে আছে দোলনা জাতীয় চেয়ারে 
তুমি নাই বলে
কবিতার খাতায় মোনালিসা এঁকে কেটে দিয়েছি সন্তর্পণে 
রবি-শ্মশ্রু রেখে মধুসূদন হয়েছি বিবাগী প্যারিসে
তুমি নাই বলে 
ধুম-বৃষ্টি খরায় চৌচির ভাদ্র ছাড়াই আশ্বিনে
চাঁদোয়া রাত বড় ম্রিয়মাণ শবনম কান্নায় শিশিরে 
তুমি নাই বলে 
অলিতে-গলিতে সন্ত্রাস,বেড়েছে রাহাজানি দেশী বিদেশী মদদে  
ভোজনবিলাসী কুকুরও ছেড়েছে এ তল্লাট কাবাবি প্রহরে   
তুমি নাই বলে 
মনু মিয়া ছেড়েছে ঘর যৌবনপ্রাপ্ত সময়ে, 
সর্পরাগিনী স্বর কেন আজ বেহুলা বাসরে তবে?
তুমি নাই বলে 
পতাকা অধ্যুষিত দেশে
বর্গীরা আবার ছুটেছে শাসনে শোষণে এই বাংলাদেশে 
তুমি নাই বলে 
ফেরা হলো না আর রক্তরঞ্জিত শহীদী মিনারে 
পলাশ শিমুল ঝরে গেছে তাই বসন্ত ছাড়াই আকুলিত বিকেলে  
তুমি নাই বলেই 
বড়ু চণ্ডী এখন বৈষ্ণব প্রেমে মরেছে কিষ্কিন্ধ্যা নগরে 
তুমি নাই বলে 
হতাশার শহর এখন বেশ্যায় পরিবৃতা ছান্দসিক টাওয়ারে! 

আমাকে দুঃখ দিলে 

আমাকে দুঃখ দিলে 
আষাঢ়ে মেঘ কাতর বিধ্বস্ত হয়ে উড়ে যাবে উত্তরে 
গণবিদ্রোহে বৃষ্টিরা সব বসে পড়বে বরফাবৃত সাইবেরিয়া পাহাড়ে
ধনুক ভাঙা পণে ফিরে আসবে না অর্জুন আর্য মোর্য সিন্ধু প্রদেশে 
আমাকে দুঃখ দিলে 
শরৎ সকাল আর আগুন সাজে সাজবে না হেলে পড়া কার্তিকে 
বৈশাখ ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হবে দেশ শিউলী ফোটা আশ্বিনে 
সাঁতার ভুলে যাবে চাপিলা বাঁকরুদ্ধ জলে নীলপদ্ম শ্রাবণে 
আমাকে দুঃখ দিলে 
ভুলে যাবে চাষা বন্ধ্যা ছিল জমি বীর্যহীন অগ্রহায়ণে 
ফাল্গুন পোড়া আগুনে চৈত্র আর থাকবে না গোলাপ সজ্জিত শহরে 
আমাকে দুঃখ দিলে 
দুঃস্বপ্নে ছাই হবে অঙ্গারপোড়া ফুল রৌদ্রতপ্ত আগুনে 
গজিয়ে উঠবে বড় বড় পাইন দেবদারু ঝাউ ফলিতকলার প্রাচীরে 
লেখা হবে না কবিতা আর চণ্ডিদাসের বাঙলা ভুলে অন্য কোন হরফে !


যা কিছু হারিয়েছি ফিরে চাই না 

যা কিছু হারিয়েছি ফিরে চাই না 
সম্মুখে আমার গড়েছি
বাধা ডিঙানোর এক সু-উচ্চ এভারেস্ট পাহাড়, 
হারিয়েছি যৌবনে ডিম পাড়া পাতিহাঁস 
শস্য শ্যামলা নদীর উচ্ছ্বাস ভরা দ্রুতগামী রুইমাছ 
ভেঙে পড়া বৃক্ষের সহস্রবার উঠে বসার অভ্যাস
নিনাদিত বজ্রের পতনোন্মুখ ধমকি উল্লাস 

যা কিছু হারিয়েছি ফিরে চাই না
অঘোষিত প্রেমে যুদ্ধ বিজয়িনী দ্রৌপদী উপাখ্যান 
সিরাজ পতনে উমিচাঁদ আর মোহনলাল আখ্যান, 
ফিরে চাই না 
জীবন যৌবন যা কিছু হারিয়ে-
দেবতা মাল্যে স্বর্গ শিখরে রাজ্যাভিষেকে অধিষ্ঠান !  


তুমি নেই বলে (৩)

তুমি নেই বলে
চৈত্র ঝঞ্ঝা দেশে সব ঋতুই বৈশাখ হবে পলাশের ফাল্গুন সাজে 
মিছিলের মানুষ গুলো হো-চি-মিন কনফুসিয়াস হবে গুয়েভারা বেশে   
তুমি নেই বলে 
হেক্টরের মতো শিরস্ত্রাণ পরে চলে এসেছি ট্রোজান দেশে 
বিজয় যদি আসে এ্যাপোলো কৌশলে 
তবে মেনিলাস সহ একিলিসকে ঝুলিয়ে মারবো দার্দানাস বুকে 
আর তা যদি না হয়, তবে 
নিজেই মরবো থেটিসপুত্র একিলিস তলোয়ারে
তুমি নেই বলে 
পতাকা শোভিত দেশে সব প্রেমিকই আজ বিউগল হাতে 
সাত কোটি গোলাপ অভিবাদনে রণতূর্য বহরে 
তুমি নেই বলে 
জননী ভার্যা ভুলেছে 'প্রেম' দেশে দেশে যুদ্ধ বিগ্রহে 
অশান্তির বাতাবরণে
তাইতো আজ 'কুরুক্ষেত্র' স্বর্গ মর্ত্য পাতাল জুড়ে!  


আরো পড়ুন...

কবি আমিনুল ইসলাম মুল্যায়ন প্রবন্ধ পড়ুন এখানে 
ড. আলী রেজার প্রবন্ধ পড়ুন এখানে ক্লিক করে
মোহাম্মদ জসিমের ভিন্ন রঙের কবিতা পড়ুন এখানে
জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ভিন্ন স্বাদের কবিতা পড়ুন এখানে
ওপার বাংলার বিখ্যাত কবি রবীন বসুর কবিতা পড়ুন ক্লিক
ওপারের কবি তৈমুর খানের কবিতা পড়ুন এখানে

1 মন্তব্যসমূহ

Thanks

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Thanks

নবীনতর পূর্বতন