ভাবুক মাস্টারের পাথর।। অনন্য রাসেল।। golpo.story by ONONNO RASEL..KUASHA

গল্পঃ

গল্প।। মাস্টার মশাই


ভাবুক মাস্টারের পাথর
অনন্য রাসেল 


শাহিনুর শাহিন কলাপাড়ার বাসিন্দা। কলাপাড়া থেকে নিশিন্দারা গ্রাম আসতে প্রায় এক কিলো হাঁটতে হয়।
এ পথে নিয়মিত তাকে হেটে যেতে হয়।
প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটায় সে রওনা হয় আবার ফিরতি পথে সাড়ে তিনটায় সে বের হয়। নিশিন্দারা গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার সে।  লোকে তারে নাম দিয়েছে ভাবুক মাস্টার। সে পথ দিয়ে যায় আর কী যেন ভাবে।
ভাবতে ভাবতে কখনো সে আইলে নেম আসে।
কেউ দেখে সে ধানের পাতা দেখছে।
কেউ দেখে সে বেগুনের ক্ষেতে নেমে গেছে।
সে যখন পাটক্ষেতে নামে তখন লোকে ভাবে হয়ত জুরুরি কাজ করতে নামছে। 
কখনো গরুর কাছে গিয়ে একটানা তাকিয়ে থাকে।
এভাবে গাছপালা ক্ষেত খামার আর গরু ছাগল দেখতে দেখতে ১০ মিনিটের পথ সে প্রায় ১  ঘন্টা লাগায়।
ঠিক সাড়ে নয়টা স্কুলে প্রবেশ করে।
সে কিছুদিন হলো হেড মাস্টারের দায়িত্ব পেয়েছে। এই দায়িত্ব হয়েছে সার।তার ভাবুক মনকে দিন দিন অসার করে দিচ্ছে।তার ভাবুক অভিব্যাক্তি,রসমেদুর কথা তার কৌতুক মিশ্রিত বয়ান আর চলে না।এখন তিনি গম্ভীর, প্রায় নির্বাক,আর রাশভারি হয়ে উঠছেন দিনের পর দিন।হারিয়ে যাচ্ছে তার সহজ সরল অভিব্যাক্তি।সবাই বঞ্চিত হচ্ছেন তার সরেশ বচন থেকে।তিনি ভীষণ বই পড়ুয়া। কিন্তু এখন তার বই পড়া হয়ে ওঠে না। এক সময় স্বপ্ন দেখতেন কালভার্টের জমি ভরাট করে সেখানে গনপাঠাগার স্থাপন করবেন কিন্তু তা হয়ে উঠছে না। বরং তিনি দিন দিন অর্থ গেদু হয়ে যাচ্ছেন। তিনি যথা সময়ে যথা কাজ করা মানুষ। সেটা আরও কঠোর হচ্ছে।

দপ্তরী আর ঘড়ি দেখে না।
হেড স্যার প্রবেশ করলেই বেল দেয়। বুঝে যায় এখন সময় হয়েছে।
ইদানীং সে লক্ষ্য করে টোকরাকান্দির কালভারেটের কাছে একটা বড় পাথর পড়ে আছে।
প্রায় রাস্তার মাঝখানে। কে ফেলে রেখেছে তা বলতে পারে না। পাথর থাকার কারণে ভ্যান চলাচল করতে পারে না।
সে আসার পর দেখে এসেছে।
কিন্তু পাথর কোথা থেকে আসলো? 
সে কোন হদিস পায় না।
এভাবে সপ্তাহ খানেক কেটে গেল। 
রবিবার স্কুলে যাওয়ার সময় সে ভাবল এই পাথর হাত দুয়েক পিছনে ছড়িয়ে দিতে হবে।
সে পাথর কে ঠেলতে লাগলো কিন্তু পাথর নড়লো না।
মিনিট দশক চেষ্টা করে হেদাইয়ের চায়ের দোকানে চা খেয়ে রওনা হলো। বছরখানেক হলো চার রাস্তার মোড়ে একেবারে খোলা প্রান্তরে চায়ের দোকান দিয়ে সাড়া ফেলেছে। ভ্যানগুলো এখানে ভীড় জমায়।সব সময় লোকজন এখানে ভীড় করে।আগে যারা বটতলা, বাশতলা বসে সময় কাটাতো তারা এখন এখানে সময় ব্যয় করে। টেভি দেখে তার রাজনৈতিক আলাপ আর খোশ গল্পের আলাপ হয়।
আগে গাছতলায় বসে জমি চাষবাসের আলাপ হতো।ছেলে মেয়েদের বিভিন্ন বিষয় আশয় নিয়ে আলাপ হতো।আর এখন নিন্দা আর পরনিন্দা চর্চা বেশি হচ্ছে।তবে খেলা দেখা আর জুয়া খেলার প্রবণতা বেড়েছে।এখন আর বাজারে গিয়ে চা খেতে হয় না,বিড়ি আনতে দু কিলোমিটার হাঁটতে হয় না।কেউ কেউ সকালের নাস্তা এখানেই সেরে নেয়।সবচেয়ে উপকার হয়ে বাবর আলীর মতো সুদ কারকারীর।সেখানে বসে তার লেনদেন সারেন। সুদের কারবার বৃদ্ধ পেয়েছে। প্রতিদিন চা খেতে খেতে মাস্টার ভাবে ধানের গোছার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে সুদের কারবার। দিন দিন অতি গরীব হচ্ছে মানুষগুলো। সবচেয়ে অবাক লাগে মানুষের আচরণের অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখে। সবার হাতে স্মার্ট ফোন, অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েদের হাতে স্মার্ট ফোন।এত টাকা তারা কিভাবে পায়?
সুদের ধার নিয়ে ফোন কেনে তারা? 
সবার প্রায় দুই তিন হাজার কিস্তি। এছাড়াও আছে বিভিন্ন এনজিও কিস্তি। চারিদিকে এত সুদের কারবার অথচ বিস্ময় লাগে সবাই ইসলামী ওয়াজ শোনে, প্রায় সবার মুখে দাঁড়ি। কথায় কথায় ইসলামি বয়ান দেয়। যারা সুদের কারবারী মাথায় টুপি জ্বল জ্বল করে।তারা সবসময় ইসলামি শব্দ উচ্চারণ করে। মনে হয় এমন ধার্মিক মানুষ এ তল্লাটে আর নাই।
এসব ভাবে আর ভাবে। এদের ধর্ম্প্রীতি দেখে উধ্বপানে তাকিয়ে বলে--
আল্লাহ দেখিস।

কবিতার বরপুত্র আসাদ চৌধুরি এখানে পড়ুন
english article here
poem by timur khan here
বাস্তুহারা তারার ইশতেহার পড়ুন এখানে
সুশান্ত হালদারের কবিতা পড়ুন এখানে
মায়াপথিক এখানে
নয়ন আহমেদ এর কবিতা এখানে 
article of law and literature : click here
লতিফ জোয়ার্দারের কবিতা পড়ুন এখানে
nobel prizev:2025 on litterature here
ইসলাম তৌহীদের কবিতা পড়ুন এখানে
মহসিন খোন্দকারের কবিতা পড়ুন এখানে
গল্প বরফের ছুরি পড়ুন এখানে

বিভিন্ন রকমের ভ্যান এ রাস্তায় চলে কিন্তু কেউ তারে জিজ্ঞাস করে না যাবে নাকি।
সবাই জানে ভাবুক মাস্টার ভ্যানে চড়ে না।
হাঁটা তার নেশা। 
কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে হাঁটতে তার ভালো লাগে।
 স্কুলে হেঁটেই যায়। যেদিন হাঁটতে কষ্ট হয় সেদিন সে বুঝতে পারে তার শরীর ভালো না।অসুখ আসন্ন, সতর্ক হয়।
সে আবার কবিরাজ গোছের মানুষ। বিভিন্ন গাছপালা নিয়ে সেভাবে,পর্যবেক্ষণ করে।কেউ চাইলে সে গাছের নাম করে সেবা দেয়। সে কাউকে বলে না এটা কাজ করবে।বলে উপকার পাবে। ডাক্তারি বিদ্যার বিকল্প নাই। হোমিপ্যাথি,কবিরাজি সব প্রাথমিক চিকিৎসা। 

হে আব্বাস তোমার বেগুন ক্ষেতের এ অবস্থা কেন?
স্যার, এবার একটু পানি কম পড়েছে।
পর্যাপ্ত পানি দেও নইলে পোকা ধরবে।
আবার হাঁটে 
কী রে হরি ঘর ভাঙ্গিস যে 
মাস্টার দাদা, নতুন টিনের ঘর দিব।
আবার চলে স্কুলে যায়।
দপ্তরীকে বলে রতন মাস্টারকে ডাক দে।

রতন তার পাশের গ্রাম মাঝিপাড়ার বাসিন্দা। মাঝি পড়ার প্রথম শিক্ষিত ব্যাক্তি।রতন পৈতৃক পেশা ছেড়ে স্কুলে মাস্টারি করছে।তারা ৭ জন মিলে ২০০০ সালে গড়ে তোলে এই স্কুল।  সরকার সব প্রাইমারি সরকারি করলে তারা সরকারি হয়।রতন এখনো পুর্বের পেশা ছেড়ে পুরো দস্তুর মাস্টার।তবে পাশাপাশি সে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে।
তার ছোট ভাই জগেন এসব দেখে। জগেন হাইস্কুল পাশ করেনি, এইসব মাছ চাষ করে দিন চলে। বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যায় কিন্তু রাজনীতি করে না। মাঝে মাঝে ভাবে মেম্বারি নির্বাচন করবে কিন্তু সংখ্যালঘু হওয়ায় সেটা বাদ দেয়।যদিও এলাকার চেয়ারম্যান তাদের ধর্মে লোক গিরিদাস মন্ডল। সে গিরিদাস মন্ডলের ডান হাত এটা সবাই জানে। জগেন কারো ক্ষতি করছে এটা কেউ বলতে পারবে না। জগেন থাকার কারণে পাড়ায় ধুমধামে লক্ষ্মী পুজা হয়,এবার দুর্গা পুজার আয়োজন করেছে।মাঝিদের দুর্গা পুজা দেখতে কালিয়াকৈর, বেটখের সিমলা, মধ্যভাগ,ছনকা থেকে লোক আসে। 
সবাই বলে জগনের দুর্গা। 
এবার দুর্গার মুর্তির সাথে জগনের বউয়ের মুর্তির মিল আছে।
অন্য ধর্মের লোক দেখে আর বলে 
দুর্গা জগনের বউ রুপে এলো বধোহয়।
বছর খানে আগে পাথরঘাটা এলাকার কমুদ মন্ডলের বড় মেয়েকে বিয়ে করেছে। কমুদ মন্ডল বিত্তবান তবে ভবঘুরে স্বভাবের। রতন মাস্টারের সাথে তার বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক। পুজাপার্বনে ছাইপাশ খায়। রতন কবি টাইপের মানুষ। তার বাল্যবন্ধু সুর্যনন্দন একজন কবি। তার প্রভাবে সেও কবিতা লেখে। কবিতা হয় না  ঠিক কিন্তু বউকে খুশি করান যায়।তার বউ কবিতা পড়তে ও শুনতে পছন্দ করে। তার কর্তা কবিয়াল ছিলো।  মাজু কবিওয়াল বললে এখনো অনেকে চেনে। 
যে ঘরে বাস করে সতী 
সে ঘরে নেভেনা জ্যোতি। মাজু কবিয়ালের এ বাক্যকে বেদবাক্য মনে করে সে।

মাজু কবিয়াল একবার মন্ডলবাড়ি এসেছিলো কবিগান গাইতে। সেখানে হাওদার মন্ডলের সাথে পরিচয় হয়। দুজনের বন্ধুত্ব হয়।হাওলদার মন্ডল ভালো হারমোনিয়াম বাজায়। সে শুনে মাজু গায়েনের দলে যোগ দিয়ে সারা উত্তরবঙ্গ চষে বেড়ায়। পুত্রের সাথে বিয়ে দেয় মাজু কবিরাজের নাতনীকে।

রহিম বাড়ির কালভার্টের কাছে পাথর কী দেখছ।
জি 
কে রেখেছে। 
তা বলতে পারব না স্যার।
ভোরে হাঁটতে হাঁটতে দেখি এক বিরাট পাথর পড়ে আছে সড়কের মাঝ বরাবর।
লোকজন বলে অলৌকিক পাথর।  শনিবার ঝড়ের পর থেকে এই পাথর এখানে আছে।
পাথরকে ঘিরে চলছে জল্পনা কল্পনা। 
তুমি কী আজ পাথর দেখেছ 
দেখেছি।
কী দেখলে!  
তেমন কিছু না। একটা বিরাট পাথর,হালকা কালচে রঙ।
আমি দেখলাম পাথরে গায়ে দুধ দেয়া,আর সিঁদুরের রঙ্গ। 
কেউ মনে হয় পুজা করছে।
খোঁজ নেও কে পুজা দেয়।
কেন পুজা করে।
বিকালে স্কুল থেকে ফেরার পর শাহিন মাস্টার আবার পাথর ধাক্কা দিলো কিন্তু পাথর সড়লো না।
এভাবে দশদিন কেটে গেলো। 
এভাবে পাথর নিয়ে চলছে জল্পনা কল্পনা। 
সোমবার বিকালে মাস্টার যখন পাথর সড়ানোর চেষ্টা করছে। তখন হেদাই মোড় থেকে কয়েকজন ভ্যানওয়ালা 
এগিয়ে এলো।
মাস্টার সাব কি করেন? 
পাথরটা সরানোর চেষ্টা করছি।
একেবারে রাস্তার মাঝে। লোকজনের যাতায়াতের অসুবিধা হচ্ছে।
পরে সবাই ধাক্কা দিয়ে পাথর ঠেলে কিনারায় রেখে দিলো।
সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে--
দেখ সবাই একত্রে কাজ করলে কত সহজে কঠিন কাজ আয়েসে করা যায়।একতা পারে অসম্ভবকে সম্ভব কর‍্তে। 
সবাই চলে গেলে পাথরের উপরে বসে ভাবে 
মানুষগুলো আর এক নাই। ভাইয়ে ভাইয়ে বিভাজন। ধর্মে ধর্মে বিভাজন। কর্মে কর্মে বিভাজন। যেন সবাই ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপ। কেউ কারো না।

কেবল রাজনীতি তাদের বিভাজন করে রেখেছে। ভোটের রাজনীতি তাদের এক হতে দেয় না।

পাথর ঠেলে ক্লান্ত অবসন্ন কিন্তু উৎফুল্ল মন নিয়ে বাড়ি দিকে যায়।
শরীরের গতি যেন তার থেমে যাচ্ছে। দ্রুত বাড়ি ফেরে।

সেদিন রাতে বৃষ্টি হলো। অঝরো বৃষ্টি। সকালে দেখে ক্ষেতখোলা সব ডুবে গেছে। রাস্তা ডুবে গেছে। পাথর কেবল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা এলো শাহিন মাস্টারওরফে ভাবুক মাস্টার  মারা গেছে।তার জানাযা বিকেল ৪ টায় নিশিন্দারা প্রাইমারি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।

ভাবুক মাস্টারকে মাটি দিয়ে সবাই পাথরে কাছে এলো। 
তারা পাথরের নামকরণ করলো ভাবুক মাস্টারের পাথর।
কেউ কেউ বললো অলক্ষ্মী পাথর।এর কারণে মারা গেলো ভাবুক মাস্টার।
হিরা মাঝি বলে আগেই বলেছিলাম এ যে সে পাথর না।
দৈবিক পাথর।এতে হাত দিলে কেউ নিস্তার পাবে না।
মাস্টার ও পেলো না।
আসের আলী বলল মা যে বলল এটা কেরামতি পাথর। এ পাথরকে স্পর্শ করে খাস দিলে চা চাওয়া যায় তা পুরুণ হয়।
আমার হারিয়ে যাওয়া সাইকেল ফিরে পাইছি।
ভ্যানওয়ালারগুলোর ভ্যান চুরি হলো, কারো ভ্যান নষ্ট হলো।
প্রায় দশ বছর পর মাঝি পাড়ার জগনের  দুইটি জমজ পোলা হলো। লোকে বলে জগেনের বউ নাকি পাথরকে অন্ধকার রাতে পুজা করেছে।
যদিও কেউ তা দেখেনি।
পাথরকে ঘিরে জল্পনা কল্পনা। 
চেহারা দেখে লোকজন বলাবলি করছে ভাবুক মাস্টার আবার ফিরছে।
একদিন এক ফকির পাথরের কাছে কান পেতে শুনছে।
সবাই কৌতুহল নিয়ে দেখছি।
বৃদ্ধরা তাকে চেনে কেরামত ফকির হিসেবে।
ফকির বললো
এ পাথর একসময় এখান থেকে উড়ে যাবে। গিয়ে কোন এক মাদ্রাসায় আবাস নেবে।
তখন এ এলাকায় নেমে আসবে জ্ঞানের অন্ধকার।
চেয়ে দেখো পাথরের বুকে কারো যেন মাথার চিহ্ন আঁকা।কিন্তু স্পষ্ট চেনা যায় না।
ফকির চলে যাওয়ার পরের দিন সকালে লোকজন দেখলো পাথর আবার রাস্তার মাঝে চলে এসেছে।

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন