জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ৭টি কবিতা।। poems by zillur rahman shuvro।। কুয়াশা

জিল্লুর রহমান শুভ্র'র ৭টি কবিতা


দেহখানি তার চিকন চাঁদ

ঘুমহীন রাত; বিরল চিরুনিতল্লাশ
কোথাও নেই তুমি!
অবশেষে ধূসর স্মৃতি ফিনফিনে বাতাসের মতো
টোকা দেয় মনের জানালায়
--চুঁ চুঁ শব্দে গিয়েছিল ট্রেন গলায় ফাঁস দেওয়া বিকেলের।

কোনোদিন এত ভীত ছিলাম না;
দৌড়াতে পারিনি হোঁচট খাওয়ার ভয়ে
ধরতে পারিনি তোমার হাত।

একটু একটু মনে পড়ে
তোমার হলুদ ওড়নার এক প্রান্ত তখনও উড়ছিল বাতাসে; 
ছিল শতেক খোয়ারি মায়ার প্রলোভন তাতে।

নারী পটানোর ম্যাকিয়াভেলি কৌশল জানতাম না আমি,
খুব আলাভোলা সাদাসিধে গোবেচারি একজন,
মনটা ছিল নরম কাদামাটি;
ফুলের সুষমা দিতে এসে গড়েছে কেউ কীটপতঙ্গের বেলাভূমি।

মাকে ছাড়া নারী কী জিনিস, বুঝিনি আমি
বুঝিনি বয়সের শিরা-উপশিরা হা করে থাকে
কোনও কলাবতীর স্পর্শ পেতে। 

তখন ক্লাস এইটে
বয়ঃসন্ধিকালের কপাট খুলে চিকন সরু মোচ
সবে প্রদর্শন শুরু; অণ্ডকোষ তখনও চাঁদ ও
সূর্যের পার্থক্য শেখেনি।

একদিন দুপুর, ক্লাসবিরতির সময়,
স্কুলমাঠে ছিলাম পেলের অনুজ হব বলে।
আমাদের ক্লাসরুম ছিল কমনরুমের নিকট ঘেঁষে;
কহতব্য নয় বিপরীত লিঙ্গের এমন গালগপ্পো শোনা যেত অহরহ।
ঘণ্টা বাজলে ক্লাসে ফিরে দেখি বাংলাখাতায়
কাঁপা হাতে লেখা প্রেমের চিরকুট; সরল অথচ অন্তর্ভেদীঃ
আমি তোমাকে ভালোবাসি
তুমি আমাকে ভালোবাসো না কেন?
--চম্পা চৌধুরি

চোখে ডাক্তারি চশমা, গোলগাল চেহারা,
দেহখানি তার চিকন চাঁদ। 
কেন জানি, অন্ত্যজ মানুষের মতো মাথা হেঁট হয়ে আসত; 
বড়োলোকের মেয়ে ছিল বলেই হয়ত।

তবে দিনশেষে
হরিদ্রাভ মাঠের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সাদা বকের ঝাঁক 
দিগন্তরেখায় মিলিয়ে গেলে, আমাদের লজু-ফজু-মজুর মা
ভিক্ষের চাল নিয়ে তার গৃহে ফিরলে, শ্মশানঘাট থেকে স্নানের উদ্দেশে
হরিপদ গোয়ালা ঝুপ করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে,
পড়ার টেবিলে বাস্তুঘুঘুর মতো উড়ে উড়ে আসত তার ছায়ার কঙ্কাল;
নবীন শিল্পীর মতো গড়তাম তাকে বেহিসেবি আনন্দে।

জৈষ্ঠ্য মাসের দ্বিতীয় রবিবার। মাদারের মেলা বসত পাঠশাপিলায়।
লাঠিয়ালদের লাঠিখেলা। বাঁশের মাথায় রংবেরঙের কাপড় বেঁধে 
বাঁশটা খাড়া করে নাচাত বীরশা মণ্ডল।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এসব গৌড়ীয় খেলা। 
হঠাৎ পিঠের উপর কোমল ছোঁয়া; শিরশিরে উঠল কশেরু।
পেছনে মুখ ঘুরাতেই দেখি চম্পা চৌধুরি; ঠোঁটে লাজুক হাসি।

তারচে’বেশি লাজুক ছিলাম আমি।
পরনে বড়োভাইয়ের লুঙ্গি, তালিদেওয়া শার্ট। মাথায় জবজবে তেল।
পায়ে ছিল না সেন্ডেল।
ভিড় থেকে টেনে বের করে আমাকে,
গুড়ের জিলেপি কিনে নিয়ে বসে একান্তে;
জিলেপিই খেয়েছি, কথা বলেছি কম।

ক্লাস নাইনে স্কুল বদলালে।
অতঃপর আর হয়নি দেখা।
ধীরে ধীরে চলে গেলে অবচেতনের মিথস্ক্রিয়ায়;
বিস্মরণের ফসিল হতে।

আজ এতবছর পর...ফসিলে হঠাৎ জ¦লল ফসফরাস
...ঘোরের সুতীব্র ঝাঁকুনি দিল প্রত্যাবর্তনের অপচ্ছায়া;
কনকনে শীতের দহনে দাঁতে দাঁত যেমন ঠকঠক করে
অসতর্ক বধূর হাতফসকে পড়া থালাবাসন যেমন ঝনঝন করে
দমকা হাওয়ায় টিনের চাল যেমন অপ্রাকৃত সুরে ফিসফিস করে
তেমনি চারদিকে তোমার উপস্থিতির শব্দরাজি
বিদীর্ণ করছে যতসব প্রাচীন নীরবতার মন্তাজ,
কাঁপাচ্ছে শেকড়সুদ্ধ রোমন্থন বৃক্ষ।

আমার হৃদয়মন্দিরে তুমিই জ্বালিয়েছিলে প্রথম প্রেমের ধূপকাঠি;
সে কাঠি নেভে গেছে কখনও, আবার জ¦লে উঠেছে স্বয়ংক্রিয়।
তোমার শরীরের রংধনু থেকে গলে পড়া চুনুরি মোম
ছুঁতে পারিনি বলে বেদনায় আজও অস্থির আমি।

প্রিয় চম্পা চৌধুরি, তোমাকে শেষ দেখার পর আর দেখা হয়নি।
তোমার সরল ও মায়াভরা মুখ যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে 
আমার মানসপটে; একচুল হেরফের হয়নি।
দোপাটি করে বেণিসংহার, ভ্রæ নাচিয়ে কথা বলা,
আহা, গোপন পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়া অসাধারণ কিশোরী!

কমনরুমের পেছনে ছিল বেলগাছ।
কথায় কথায় বলে, বেল পাকিলে তাতে কাকের কী?
কাকের কিছু না হলেও আমার অনেক কিছু।
ক্লাসরুমের জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম বেলগাছটার দিকে।
আমাদের দিব্যদৃষ্টি এতটাইি প্রবল ছিল
ঠিক সেসময় বেলতলায় আসতে পাকাবেল কুড়ানোর ছলে।

একদিন পাকাবেল কুড়িয়ে পেলে
ইশারায় কাছে ডাকলে।
উত্তরে আমিও ইশারার শরণাপন্ন হলাম।
গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে 
জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে
বেলটা হাতবদল করলে।

সেই বেলগাছটা উড়ে উড়ে আসে।
এখন আর কেউ ইশারা করে না।
...ক্রমশ জীবনের সমস্ত রং হতে থাকে খুন
অন্ধকার অথবা খণ্ডিত জোছনায় বাজে কেবল প্রথম প্রেমের ধুন।


আরো পড়ুন

রেজাউদ্দিন স্টালিন এর কবিতা পড়ুন
শামসুর রাহমানের গদ্য পড়ুন
নয়ন আহমেদ এর কবিতা পড়ুন
ভাস্কর চৌধুরীর কবিতা পড়ুন
নববর্ষের গল্পগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের ছড়াগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের গদ্য পড়ুন এখানে
নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা পড়ুন এখানে
স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা।।২৬ ছড়া পর্ব এখানে পড়ুন
ঈদ সংখ্যা।।২৬ প্রবন্ধ পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ গল্প পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ কবিতা পর্ব পড়ুন একানে
অনন্ত পৃথ্বীরাজ এর রোমান্টিক কবিতা পড়ুন
একুশের একগুচ্ছ কবিতা পড়ুন এখানে
দুলাল সরকার এর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
খৈয়াম কাদেরের কবিতা পড়ুন এখানে
মাহবুবার করিমের কবিতার পড়ুন এখানে
খসরু পারভেজের কবিতা পড়ুন এখানে
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে


খুনের অধিকার

প্রতিটি সন্দেহের পেছনে যুক্তি থাকে, আবার না-ও থাকতে পারে। 
রুমালে রক্তের দাগ দেখে যদি চমকে ওঠে ব্যাধের সন্ধ্যা, 
ভেবো নিয়ো আমিই সেই খুনি।

খুনিরা ভাবপ্রবণ বিস্মরণের স্মৃতিকথা লেখে না; 
তাদের জন্মগত অধিকার আকাশের চিৎকার।

সমুদ্রের সঙ্গে অতিবালকীয় ঝর্ণার মার্বেল খেলা, এবং
পাখিদের যমজ ডানায় এলিউথেরিয়ার মন্থনক্রিয়া দেখতে দেখতে,
দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যদুপুর প্রতিদিন খুন করে নিজকে;
এটাও তার জন্মগত অধিকার।
অধিকারের ক্রমোজম 
ধাবমান অশ্বখুড়ে, ঈগলের ছোঁ মারার মুহূর্তে 
ঈশ্বরের সামনে জিপার খোলে; এবং
পিরামিডের প্রেসার মাপে যে ত্রয়ী নক্ষত্র
অস্ফুট দহনের অক্ষরে তাদেরকে লেখেঃ
আমাদের প্রত্যেকের অধিকার আছে খুন করার, এবং
খুন হয়ে যাওয়ার।


নারকেল জিঞ্জিরা

আহা সমুদ্র, তোমার কপালে এক ফোঁটা মৃত্তিকার টিপ!
হাওয়া এসে উড়িয়ে নিতে চায়, ওড়ে না; আর
আমরা উড়তে আসি, উড়তে উড়তে নক্ষত্রপুঞ্জে; দস্তানা খুলে 
তারা অপেক্ষা করে আমাদের উচ্ছাসের হৃৎপিণ্ড ছুঁতে।
আমরা জানি সমুদ্র ঘুমায় না
তার ঘুমহীন চোখে ঘুমিয়ে থাকে আগুনমুখো দানবরা
ঘুম ভাঙলেই বেসামাল; ধৈর্যহীন তারা।
শিলাপাথর আর শৈবালের প্রচ্ছদ ঘেঁটে পাই
চৈত্রমাসে অবসন্ন আরব বণিকদের দিয়েছিলে ঠাঁই।
হুমায়ূন না রামায়ন, কে একজন রেখে গেছেন মোহ;
চাঁদনিপসর রাতে মৎস্যকুমারীরা আসে, 
হয়ত তিনিও আসেন
সোনা মোড়ানো কুরসিতে বসে 
আমার মতো মুরিদদের মাথা ছুঁয়ে দেন আশ্চর্য ভঙ্গিতে। 
মোহ কাটে অবশেষে মাছপোড়া গন্ধে 
 তীব্র ইশারার ডাক ছিল ছেঁড়াদ্বীপের;
দূরদেশি এক পাখি আত্মজীবনী শুনছিল ষোড়শী রোদের 
বিদ্রæপ বাণ ছুঁড়লাম তাকে---তোরা তো শীতের পাখি।
পরদিন, ফেলে আসা বন্দরে মৃগনাভির টানে ফের সংযাত্রা,
ফের নীল জলে ঢেউয়ের মানচিত্র আঁকা...
তুই কীসের পাখি? শীতের পাখিটি হঠাৎ প্রশ্ন ছোঁড়ে।
তার প্রশ্নের উত্তরে 
অতঃপর, শ্মশ্রসাশোভিত আব্বা এলেন ফিরে:
এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে
সবচেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন--”যেতে নাহি দিব। হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।”

বস্তুত আমরা সবাই শীতের পাখি।


জাদুসম্রাট

ব্রেকিং নিউজঃ বিমান দুর্ঘটনায় জাদুসম্রাট মারা গেছেন।
কে এই জাদুসম্রাট? মাথা খাটাই, আসুন! তেমন কেউ আছেন?
অহর্নিশ কালো আলখেল্লার এই জাদুসম্রাট 
ভেলকি দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা করেছেন লোপাট 
দুবাই, লন্ডন, নিউইয়র্কে গড়ে তুলেছেন সুরম্য প্রাসাদ
পানশালায় চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতি, দাঁত কেলিয়ে হাসে 
যতসব রঙিন বোতল, ফিনিশীয় নারীদের নাচের মুদ্রায় 
নরক গুলজার 
...শত শত প্রেপ্সু রমণীর বুকে ছড়িয়েছেন উষ্ণতার ভেলকি, 
নিতম্বে ভরত নাট্যম। 
পথশিশুরা অনাহারে কংকালসার
অথচ পশুপ্রেমী হিসেবে যথেষ্ট হাঁকডাক তার
তিনি চাটতেন মাংস, আর কুকুরেরা চাটত হাড়;
অতঃপর কুকুরদের দোয়া আয়োজনঃ হে জাদুসম্রাট, 
সারা জাঁহাসে আচ্ছা হাড্ডি হামারা! অন্তর থেকে ধন্যবাদ।

স্থগিত করা হোক তার শোকসভা
... এসে গেছেন আরেক জাদুসম্রাট;
তাণ্ডবীয় ভেলকি দেখাতে তার।


উদ্বাস্তু জীবন

সব ফেলে বেছে নিয়েছি উদ্বাস্তু জীবন;
আমাকে আর কেউ বলে না, তুমি কিচ্ছু পারো না।
পেন্থেসিলিয়াকে হত্যা করেছিল অ্যাকিলিস
জয়ের নেশা তার রক্তের বুদবুদ;
আমার হাত কাঁপে, ঘাতক তরবারি
মিহি পালকের মতো খসে পড়ে
পক্ষাঘাতগ্রস্তের আচকানের নিচে শুশ্রæষা হয়ে।
চুনখোর মুখের আদল ভেঙে গড়েছি
কলাবতীর অষ্টপ্রহর
অথচ তোমারই অমাবস্যায় ডুবে গেছে আমার পূর্ণিমা।
কফি রং বিষাদ কালাচাঁদের খিড়কি খোঁজে; 
স্বপ্নতাড়িত বাতাস কৃতাঞ্জলিপুটে---যেও না ওইখানে!
নিশ্চল বোধের অগ্নিকুণ্ডের মতো ফিসফিস করি
পৃথিবীর কানে

থাকতে চাই এভাবেই যে শ্রাবনসন্ধ্যা সিঁদ কাটে
ঘাইমারা স্মৃতির ঘুমঘরে তার কুহকী টানে।
বেশ আছি এই উদ্বাস্তু জীবনে
কালো চিতার নখর নেই, নেই হাড়হিম দৃশ্যসঙ্গীত;
চুইয়ে চুইয়ে পড়া হিমাংশুর রক্ত পান করি, আর
ভুলের বায়োস্কোপ দেখি পরিযায়ী পাখিদের চোখে।



কেউ বোঝে না 

কতকাল অপেক্ষায় থেকেছি 
আসব আসব করেও আসোনি।
নির্ভেজাল মিথ্যের আশ্বাস জেনেও 
তোমাকে অবিশ্বাস করিনি।
সন্ধ্যার আঁধার কাতুকুতি দেয় 
আড়মোড়া ভেঙে জানালায় বসি।
আকাশের মন ভালো থাকলে 
বৃষ্টি নামায়, ক্ষত পাঁজর ছুঁয়ে 
বলে, আহারে!
অহঙ্কারী মেয়ে, পোষা পাখির কষ্ট বোঝো
আমার কষ্ট বোঝো না?
সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমের ঝাড়বাতির নিচে পা ছড়িয়ে বসো;
ঘুমাও না রাতে পোশাকের ভাঁজ 
নষ্ট হবে বলে। আর, 
এদিকে আমি ঘুমাতে পারি না তোমার চিন্তায়।


ছায়া ও চিহ্ন

ঘূর্ণিহীন জলে দ্রাঘিমার বিষণ্ন ছায়া
পালিনড্রোম শব্দের মতো পাঠ করে আমাকে;
অতঃপর যে চিহ্ন দিগন্তরেখায় হরিণীর উপবন আঁকে
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় সেদিকে-তার দিকে--
অন্ধ শিকারির ভয়ে চিহ্ন সরে গেলে হিমঘরে
যে পাখি সম্প্রদায় জোছনা দেখেনি হাহাকার করে;
বিষাদের ঘনতায় ডটচিহ্ন দেখে
দূরগামী ছায়া ফিরে আসার গন্ধ শোঁকে।

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন