গুচ্ছকবিতা।। মুস্তফা হাবীব
তবু সুমিত্রার চোখে
বঙ্গোপসাগরের উন্মত্ত জলের ছোঁয়ায়
উজ্জীবিত আমার বাংলা, গৌরবগাথা দিগন্ত।
উর্বর মাটি, উর্বর সব মানুষের মন
মানে না ঘাতক পাষাণ পাথরের কোনো আগ্রাসন ।
এখানে পরদেশি ধুসর দূর মেঘের ছলনায়
পথ হারায়না আমার সুমিত্রা,
বুর্জোয়া আধিপাত্য সাপের ছোবলে- বিষবাষ্পে
ঘরনড়ে হয়ে ওঠে আমার প্রিয় ঠিকানা বসতভিটা
কালকূট মীরজাফর দেশদ্রোহীর বদন্যতায়
পদ্মার পদ্ম, মেঘনার মহিমা নিয়ে যায় শকুন শ্বাপদেরা।
তবু সুমিত্রার চোখে
সন্ধ্যা সুগন্ধা রূপসা করোতোয়া কীর্তনখোলার হাসি,
জাফলং মাধবকুণ্ডের মাদকতা, দ্বীপপুঞ্জের দীপাবলি।
হলদিয়া মিশর প্যারিসের শীতল রোদের পরশ মেখে
যেখানে যাই -যতোদূর যাই, ফিরে আসি
আমি সুমিত্রাকেই ভালোবাসি;
সুমিত্রা আমার প্রিয় জন্মভূমি সোনার বাংলাদেশ।
আয়নাবাজি
শৃঙ্খলা ভঙ্গের দৈব দুর্ঘটনা না ঘটলে
সকালবেলার সূর্যওঠা দেখে বুঝতে পারি
দিনটি কেমন যাবে।
আষাঢ় শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর সকাল দেখে বলতে পারি
রাতের আকাশে তারা ভাসবে কিনা
পূর্ণিমার চাঁদ হাসবে কিনা।
ইদানিং অস্তগামী রৌদ্রের বয়ান শুনে বিব্রত হই,
সর্বত্রই ছড়াচ্ছে প্রতিশ্রুতি ব্যঞ্জনা
কোথাও থাকবে না আলোহীন ডেরা, খাসমহল।
শীতের শরীরে জড়াবে কাশ্মিরি শাল।
শৈশব গেলো, যৌবন গেলো, বিকেল যায়যায়
একটি খরকুটো ছিড়ে দু টুকরো করতে পারোনি
ছিঁড়তে পারোনি স্বৈরবৃক্ষের ছোট্ট একটি পাতা
এখন নাকি সব পারবে,
পারবে সমুদ্রের জল সেচে ডাঙায় ওঠাতে।
এইসব স্তুতি শুধুই নবতর ফাঁদ,
আয়নাবাজি খেলা, প্রতারণার সনাতন জালবোনা;
তবে কি যুগে যুগে এভাবেই প্রতারিত হবে
দেশ, আমার বাংলাদেশ!
সময়ের ধুুমকেতু
আমার এই বাংলার মাঠ প্রান্তর আকাশ থেকে
নিঃসীম অন্ধকার- বৈষম্য তাড়াবার জন্য
শুনেছি সুতীব্র চিৎকারে ধুমকেতুর অঙ্গীকার
পোড়াতে হবে শয়তানের সনাতন রোজনামচা ',
তাদের একটি অশান্ত অনন্য ধুমকেতু সোলায়মান হাদি।
অপ্রতিরোধ্য তেজে জ্বলে উঠেছিল সে
নজরুল ভঙ্গিমায় কাঁপিয়ে দিয়েছিল রাজপথ
তার প্রতিবাদী প্রখর স্বর শুনে
রক্তখেকো হায়েনারা জ্বলে পুড়ে খাক ,
পতিত স্বৈরিণীর আকাঙ্ক্ষা মেটাতে ওরা সংঘবদ্ধ।
অতঃপর যা হলো .......
বাকরুদ্ধ আমি,ভাষাহীন পাথরের বিমূর্ত চিত্ত নিয়ে
হারিয়ে ফেলি খেই, দেখি হাদীর জানাজা- জনসমুদ্র
বর্ণনার শব্দাবলি ঝরছে কাঙ্খিত শব্দকোষ থেকে।
এখন আমি এবং আমরা দাঁড়িয়ে আছি
এক সমুদ্র গোপন বারুদের সম্মুখে
অপেক্ষায় আছি, দেখব আগামীর মহাপ্রলয়।
নন্দিতা, দাগ রেখে যাও
মাদার তেরেসা বেঁচে আছে মানুষের ভালোবাসায়
তুমিও বেঁচে থাকো অনন্ত চরাচরে , শুভ্র বাতাসে
সুকর্মের গৌরবে সৌরভ ছড়াবে সুদূর ভবিষ্যতে
বিশ্বাস করি, সৃষ্টির নদী কখনও হারায়না গতিপথ।
জন্ম তোমার সার্থক হোক এই মায়াময় পৃথিবীতে,
আসা যাওয়ার মাস্তুলে রেখে যাও সুবর্ণ ফসল
শিল্পভাবনায় অনাবিল বৃষ্টি হোক প্রশান্ত হৃদয়ে
আনন্দ জোয়ারে ভাসবে অরণ্য, হাসবে চন্দ্রতারা ।
অনুপম ধারায় গোলাপ হয়ে ফোটো, খুশবু ছড়াও,
পথের মাঝে কখনও পথ হারাতে নেই
মরুভূমিতে বৃথাই জলসেচ, আলেয়ার আলো
কূলহারা নদীর ঠিকানা কেউ কি পেয়েছে খুঁজে।
তোমার মননে ফুটুক অপার প্রণয়, গুচ্ছ জলপদ্ম
চারদিকের তিমির আঁধার তাড়িয়ে দেখব
সরোজিনী নাইডুর প্রতিরূপে আবির্ভূত হও বন্ধু
নন্দিতা ,দাগ রেখে যাও অনন্যরূপে শতবার।
কারো সাধ্য নেই
কারো সাধ্য নেই আমাকে হারাবার
সব দেখেছি, অবশিষ্ট কিছু নেই -- না দেখার।
দেখেছি...
রাতের আয়োজন শেষে প্রভাতে ফুল ফুটতে
বসন্তে- বৃক্ষের শাখায় সবুজ পাতার কোলাহল
শীতের থাপ্পর খেয়ে
ম্লান জীর্ণ শীর্ণ অবয়বে নিঃসঙ্গ ঝরতে
ফোরক পরা কিশোরীর অমলিন হাসি
যুগল পুরুষ - রমণীর অনিবার্য প্রেম জড়াজড়ি,
বিচ্ছেদ বেদনা।
এবং দেখেছি ....পৃথিবীকে হাসতে দখিন বাতাসে
কাঁদতে দেখেছি মাঘের হিমশীতল রাতে।
অবশিষ্ট কিছু নেই- না পাবার।
সব পেয়েছি ....
কাঁটাবনে স্বর্ণ কস্তুরী, তিলোত্তম প্রাসাস,
স্বজনদের কাছ থেকে এক সমুদ্র নীরব আঘাত
এবং আরো পেয়েছি ....
না চাইতেই নীল চাঁদোয়া, নৈসর্গিক সুখ।
অবশিষ্ট কিছু নেই, এবার ফেরার পালা
মূলের কাছে আত্মসমর্পণ,
এ সংসারের মায়া - ভার মুছে ফেলে অনন্তের পথে
মূলের সঙ্গে আত্মসমর্পণ,
কারো সাধ্য নেই আমাকে ফেরাবার!
সন্ধ্যার বালুচরে
সমুদ্র ছেড়ে এখানেও ইলিশ আসে
ওড়ে শঙ্খচিল ,পাক খায় বিকেলের স্বর্ণালী রোদে
এখানেও ভাটফুল ফোটে সন্ধ্যার ঝিরঝির বাতাসে
কচুরিফুলের নীলাভ শোভায় মুগ্ধ অতিথি বলাকা।
ধানসিড়ি আর সন্ধ্যা নদীর জলের বৈশিষ্ট্যে - রূপে
আলাদা কোনো কারিশমা আছে কিনা জানিনা
হয়তো সুরঞ্জনার প্রতিরূপে সুমিত্রাই এসেছে এখানে
এই প্রিয় সন্ধ্যা নদীর উত্তরে জারুল গাছের ছায়ায়।
জীবনানন্দ হয়তো আসেনি আমার সন্ধ্যার বালুচরে,
শোনেনি ডাঙার ঝোপে কোকিলের সুস্বাদু কুহুতান,
আমি দেখেছি সন্ধ্যার পাড়ে সুমিত্রার খোঁপাভাঙা চুল
দেখেছি অন্য সুরঞ্জার টানা টানা যুগল দীঘল চোখ।
বিরহ বেদনা বুকে পুষে যাপিত জীবন পিছনে রেখে
সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কোথায় হারালো সে! জানিনা
শুধু ক্ষয়িষ্ণু ধরাতলে রেখে যাওয়া ভাগ্যলিপি তার
পাঠ করি আমি,পাঠ করে কালের যতো নিঃসঙ্গ পাখি।
বিকেলের বৃষ্টি অতঃপর
মানবিকা,
প্রায় ত্রিশ বছর জাগতিক নদী পাড়ি দিলাম ,
কাউকে চিঠি লেখা হয়নি। না, কাউকেই না।
আজ তোমাকে লিখছি কবিতার মুক্তক ছন্দে
দিনের ক্লান্তিশেষে নিঝুম রাত্তে চিঠিটি পড়ে নিও।
অসম্ভবের পায়ে দাঁড়িয়ে
বিকেলের বৃষ্টিতে ভিজেতোমার কথা ভাবছি,
তুমি নিশ্চয়ই জানো, সুফিয়া লরেন বলেছিল......
ফেলে আসা পান্ডুর অতীতকে মুছতে
দুলতে হবে সময়ের নতুন দোলায়
উন্মোচন করতে হবে আরেকটি তৃতীয় পৃথিবী।
তুলি চাইলে আমি তোমার কাঙ্খিত সঙ্গী হব
আকাশ নীলিমায় দেখব হংসমিথুনের ওড়াওড়ি
পানসি নৌকায় ভাসব দুজন, অতঃপর দেখব
জলেডোবা ধানের ক্ষেতে পানকৌড়ির জলকেলি।
শপথ নেব দুজন দুহাত ছুঁয়ে
আগন্তুকের ভয়ে বিসর্জন দেব না প্রণয়ের সুর।
মানবিকা, প্রতিউত্তর পেতে গুনব অপেক্ষার প্রহর,
বাঁক বদলের ধারায় খুঁজব নতুন কবিতা।
ইতি, বিকেলের রৌদ্র, বাংলার ভেনিস .......
একুশের একগুচ্ছ কবিতা পড়ুন এখানে
দুলাল সরকার এর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
খৈয়াম কাদেরের কবিতা পড়ুন এখানে
মাহবুবার করিমের কবিতার পড়ুন এখানে
খসরু পারভেজের কবিতা পড়ুন এখানে
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে
বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা পড়ুন এখানে
নাগিব মাহফুজ এর উপন্যাস ভিখারি পড়ুন এখানে
কবি আমিনুল ইসলামের দারুণ কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদদ্ীন লোদীর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
রোকসানা ইয়াসমিন মণির কবিতা পড়ুন এখানে
মতিন বৈরাগীর কবিতা এখানে পড়ুন
মাসুদ মুস্তাফিজের কবিতা পড়ুন এখানে
অমিত চক্রবর্তীর কবিতা পড়ুন এখানে
জলরঙ বিকেলের আলোয়ে
মনে হচ্ছে কতো শতাব্দী তোমাকে দেখিনা
মানবিকা, কোথায় তুমি ?
একদিন শিশিরভেজা ঘাসফুল মাড়িয়ে
এসেছিলে আমার স্বপ্নীল প্রান্তরে!
সকাল দশটায় এসেছিলে
বুকের জমিনে ফোটা যুগল পদ্মকোরক অনাবৃত করে
ওড়নার আঁচল বাতাসে উড়িয়ে সরু কোমর দুলিয়ে ।
মনে পড়ে তোমার শত পবিত্র হাসির নীরব দোল
শিউলি ফুলের মতো ফুটতো বসন্ত পূর্ণিমায়
মনে পড়ে জল থইথই পুকুরে অবাধ সাঁতার কাটা ,
হট্টিহট্টি খেলার দিনগুলি ।
কোথায় তুমি মানবিকা?
এসো সন্ধ্যার অনুরাগে কোনো একদিন
সোনারঙ বিকেলের আলোয়ে উষ্ণতা পেতে দুজন
শীতের চাদর ভেবে একটু জড়িয়ে ধরি!
দেশপ্রেমের প্রদীপ্ত আলো
শতাব্দীর সীমান্ত অতিক্রম করে
কালের মাস্তুলে যারা অবিভাস্বর কাল পরম্পরায়
তারা ইতিহাসের অধিক, অণুসরনীয় মাইলফলক।
এমন একজন মহীয়সী মাতার কথা বলছি......
যিনি বাংলাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র,
কালো মেঘ দেখে অন্য কারো মতো দেশ ছেড়ে যাননি
দেশের মানুষ মেরে উড়াল দেননি নভোযানে।
সেই কালোত্তীর্ণ খালেদা জিয়ার কথা বলছি.....
জীবন বাজি রেখে আপোসহীন চেতনায়
আজও সে বাংলার মাটিকেই ভালোবাসেন,
মৃত্যুপণ লড়াইয়ে তিনি অতূল্য এক শ্রেষ্ঠ বীরাঙ্গনা।
যতোদিন পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানচিত্র থাকবে
যতোদিন সূর্য উঠবে পূর্ব দিগন্তে
অস্ত যাবে পশ্চিমে প্রতৃতির শাশ্বত সংবিধান মেনে
ইতিহাসের পাতায় তিনি ভাসবেন অমৃত,
মহাকালের ভেলায় তিনি দেশপ্রেমের প্রদীপ্ত আলো।
বেঁচে থাকার স্বপ্ন
এই পৃথিবীতে আসে আর যায় বিচিত্র ধারায়
আঠারো হাজার সৃষ্টি,
বাঁচার স্বপ্নে সবাই রচনা করেনা অমৃত সড়ক।
ভোগবিলাসের তাড়নায় না দ্যাখে সূর্য ওঠা না দ্যাখে সূর্যাস্তের অন্তিম রেখাবলি।
খাইখাই চিত্তে লুটে নেয় বিপন্ন সৃষ্টির সহায় সম্বল
গড়ে তোলে বিত্তবৈভব, আকাশছোঁয়া নীল পাহাড়,
সবকিছু কালস্রোতে ডুবিয়ে
অতঃপর নিঃশেষে নিরুদ্দেশ।
নিরন্তর এই পৃথিবীর শুভ্র আলোয়ে রেখে যাচ্ছি
এক জীবনের কর্মগাথা,
শুদ্ধ ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে খুলবে একদিন বসন্ত দুয়ার
আগামীর মাস্তুলে জ্বলবে স্বপ্নের দীপাবলি ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks