নয়ন আহমেদ এর গুচ্ছকবিতা
ব্যক্তিগত
আমার আছে দুটো আকুলতা,
চালতা পাতার মতো দুপাশে ছড়ানো।
প্রশ্রয় পেলে কাশফুলের মতো শাদা হয়।
মাননীয় বাতাস তাকে আরো উৎসাহ যোগায়।
যে কেউ ছুঁড়তে পারো
ঘৃণা ও অবজ্ঞার সুস্বাদু ব্যঞ্জন!
আকুলতাদুটো পাতিলের কালির মতোন কালো হয়!
ঐকতান
আমার ছিলো সমবায়ী কোলাহল।
যেন মুখরিত তাঁতিপাড়া।
বস্ত্রবুননের মতো বানিয়েছি সভ্যতা।
আমি ধনী ছিলাম।
নূহ বা মনুকে মনে পড়ে গেল আজ।
আমি তারও সমর্থক ছিলাম।
আমরা বানিয়েছিলাম জাহাজের প্রতিরূপ
বিনম্র আশ্রয়।
কারিগর ছিলাম।
কে ভুলে যায় আমাকে?
আমি কি তোমাদের থেকে আলাদা হয়েছিলাম?
অচেনা
একদা আমি পৌঁছেছিলাম এক নতুন শহরে।
দেখলাম, মানুষেরা বানিয়েছে এক ঝকঝকা সভ্যতা।
বার্জারের মতো দীর্ঘস্থায়ী, রং তার।
চোখে ধাঁধা লেগে যায়।
উজ্জ্বলতা ঝিলমিল করে।
আমাকে তারা তাদের এক এক করে আভিজাত্য দেখায়।
আমি সুখের অভিধান দেখি।
বানান করে করে তাদের পার্থিবতা পড়ি।
দেখি, ধানের চিটার মতো নিষ্ফলতা।
আমি কিছু হাহাকার নিয়ে ফিরে আসি।
আমি কি ছিলাম অচেনা?
পড়া
গাছের পাতাটি খুলে পড়লাম।
গাছের মাতৃভাষা বড় মানবিক; ভ্রাতৃ স্বভাবে
বাঁধে অরণ্য প্রকৃতি। গাছের সমাজে
নাই হিংসা, বিভেদ ।
যুদ্ধ নাই, ঘৃণা নাই।
রাজ্য দখলের পাঠ নাই।
নষ্ট রাজনীতি নাই। ধর্ষণের পাঠ নাই
গাছদের অভিধানে।
নারী ও শিশু পাচারের কোনো বর্ণমালা নেই গাছের পৃষ্ঠায়।
একটি পাতায় আমি দেখেছি মীমাংসিত সব বর্ণমালা।
একটি পৃষ্ঠায় আমি এঁকেছি মানুষের ভবিষ্যৎ শব্দাবলী।
প্রেমের
পুণ্যের
বর্ণমালা।
গাছের বাক্যতত্ত্বে আমি আজ আস্থা রাখি।
উদ্বাস্তু
কিছু সোনালি-সূর্যমোড়া গৃহকাল উদ্বাস্তু হয়েছে।
কিছু অবশ্যম্ভাবী আলোছায়া হারিয়ে গিয়েছে।
চিররুগ্ন হয়েছে সামষ্টিক উদযাপন;
মাছের কানকো বেয়ে বেড়ে ওঠা বিবিধ সাঁতার।
আশ্রয় আশ্রয় করে মৃত পড়ে আছে।
কিছু পুষ্পদৃশ্যে অঙ্কিত শান্ত নিঃশ্বাস কান্না দেখতে দেখতে নিহত হয়েছে।
জেনে গেছে,ধরিত্রীর সৃজনশীলতা!
এসবের কিছু জানে বহমান জিঘাংসু ভোর ;
কিছু জানে রক্তপোড়া গ্রাম।
মানুষ কি নয় রোহিঙ্গা দীর্ঘশ্বাস?
আমূল হাহাকারের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত !
ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর জংধরা মুখমণ্ডলে!
প্রশ্ন করেছি বারবার।
হারানো চুম্বনের প্রপৌত্র-স্মৃতি নাফ নদী জানে।
দেনা
তোমার ঠোঁট থেকে ধার করেছিলাম উজ্জ্বল রোদ।
আঙুল থেকে আহবান;
হাত থেকে হাতপাখার মতোন উপহার।
দাঁত থেকে আবশ্যক শুভ্রতা।
এমন করেই আমি উত্তম সওদা কিনেছিলাম।
এসব নিবিড় ফসল আর ফেরত চেয়ো না।
তোমার চোখ থেকে ধার করেছিলাম অনিবার্য অবলোকন।
নখ থেকে উদারতা;
স্মিত হাসি থেকে পার্থিবতা।
যাবতীয় সৌন্দর্য থেকে পবিত্র যাপন।
এইভাবে আমি পৃথিবীকে ক্রয় করেছিলাম।
প্রিয়তমা, আমাকে দেনা পরিশোধ করতে বলো না।
অর্জন
— কী অর্জন করো ?
: রোদ ।
— কী উপার্জন করো ?
: প্রবোধ ।
— কে স্বাগত জানায় ?
: সুপ্রভাত ।
— কী প্রার্থনা ?
: খোঁপাবাঁধা রাত ।
— কী বাসনা ?
: সূর্যের ঘরবাড়ি ।
— কী কামনা ?
: মধুবর্ষী নারী ।
—কী ভালোবাসো ?
: মুগ্ধ সকাল ।
— আর্ প্রত্যাশা ?
: দুটি বেণীবাঁধা পরকাল ।
দূরত্ব
দূরত্ব মানছে না দুটো প্রেমনিষ্ঠ শালিক ।
দূরত্ব মানছে না মাথা উঁচু করা নেপিয়ার ঘাস ।
দূরত্ব মানছে না বাতাস ।
দূরত্ব মানছে না বহমান নদী , ব্লেডের মতো ধারালো স্রোত ।
যেন গোলাপের পাঁপড়ির মতো লেগে আছে পরস্পর ।
যেন তারা সৎ প্রতিবেশীর মতোন দয়ালু ।
যেন তারা সোলেমান নবির মতোন বিবেচক ।
যেন তারা জন্ম দিচ্ছেন মানবিক ভাষাবোধ ।
যেন তারা গড়বে কোনো লোকালয় ।
যেখানে মানুষ আজও পা ফেলেনি ।
অথচ এর জন্মকথা নিহিত ছিলো গোলাপের শব্দার্থে ।
পাখির বাসাবুননের রূপকল্পে ।
মানুষ । আহা মানুষ !
এখনো তার বানানো হলো না ঘরবাড়ি ।
এখনো তার শেখা হলো না প্রেম ।
কোনো প্রত্যয় ।
দূরত্ব মানছে না মাথার চুল ।
দূরত্ব মানছে না গাছের পাতা ।
দূরত্ব মানছে না কাঁঠালের কোষ ।
দূরত্ব মানছে না একনিষ্ঠ হৃদয় ।
তাহলে হিংসার পতন হচ্ছে ।
তাহলে কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্ত থেকে পূথিবী জেগে উঠছে ।
তাহলে রাজা অশোকের অনুশোচনা থেকে প্রেম জন্ম হচ্ছে ।
তাহলে জিশুর প্রণয় বিস্তারিত হচ্ছে ।
তাহলে গৌতমের দুঃখ মুছে যাচ্ছে ।
তাহলে মুহম্মদের ভালোবাসা ধানখেতের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে।
বলো মানুষ , অনিবার্য রূপকথার জন্ম হচ্ছে ।
নদী
আহত হৃদয় নিয়ে যাই নদীটির কাছে।
মাঝি কিছুটা ভাসাতে পারে প্রাণ।
নৌকোয় শুয়ে থাকে ছইঅলা শ্রমণ।
আমৃত্যু পড়ি এই স্বলিখন:
"বাও এ জীবন"।
পেয়েছি, গতকাল তার জলজ সন্ন্যাস।
নদীটাকে আমি শোবার ঘরের পাশে টাঙিয়ে দিয়েছি।
চিরকাল
নির্বিঘ্ন কতগুলো বর্তমান ও ভবিতব্য
প্রবেশ করলো গৃহে; ছড়িয়ে পড়লো ডালপালা মেলে।
বাসন মাজার অবয়বে দেখলাম করপল্লবিত নিত্যকর্ম;
তরকারির ঝোলে দেখলাম ঢেউমাখা মাতৃভাষা।
দরজা ও জানালায় দেখলাম তার শাশ্বত চোখ।
ড্রয়ারে,শোকেসে,আলনায় ছায়া ছড়ালো চিরস্মরণীয় পত্রপল্লব।
চিরকাল স্থির হয়ে রইলো তার অনিবার্য পদধ্বনিতে
| |||||||||||||||
| |||||||||||||||


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks