কাজল রশীদ এর সিরিজ কবিতা। sirieze poems by kazol rshid কুয়াশা

কাজল রশীদ এর সিরিজ কবিতা

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো-১

শহরের শেষ ল্যাম্পপোস্টটা একা নিভে গেলে প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকে এক জোড়া বিদীর্ণ ছায়া। ট্রেনের হুইসেলগুলো এখন বিদায় জানায় না, বরং উপহাস করে একলা দীর্ঘশ্বাসকে। একসময় যে হৃদয়ে বসন্তের উৎসব হতো, আজ সেখানে কেবল বিষণ্ন মরুভূমি। পঞ্জিকার পাতায় রঙের চেয়ে ছাইয়ের দখল বেশি। এক আকাশ নীলের আশায় যে চাতক ছিল, তার কপালে জুটল কেবল ধূসর মেঘ। প্রেমের দলিলে আঁকা জলছাপ তপ্ত রোদে বাষ্প হয়ে উড়ল। আয়নার সামনে আজ এক অচেনা মানচিত্র, চোখের নিচে এক আজন্ম পরাজয়ের নীল নকশা।
স্মৃতিরা এখন হৃদপিণ্ডের অলিন্দে দখলদার। অন্য কোথাও হয়তো আমাদের গল্পের উজ্জ্বল প্রচ্ছদ, কিন্তু এখানে ধুলোমাখা পরিত্যক্ত লাইব্রেরি; যেখানে মিলনের পরিচ্ছেদগুলো উইপোকায় কাটা। বাতাস বইলে পৃথিবী বকুলের ঘ্রাণ পায়, অথচ এখানে চরাচর জুড়ে শুধু পোড়া হৃদয়ের সোঁদা গন্ধ। না পাওয়া আর হারিয়ে ফেলার মাঝে যে বিস্তর ফারাক, তা ধুলো হয়ে জমেছে। বুকভরা মরুভূমি আর ধুলোয় মোড়ানো এই জীবনে ফেরার সব পথ আজ রুদ্ধ।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো -২

বুকের ভেতর
অদৃশ্য এক মরুভূমি,
যেখানে শব্দেরা বালুর দানা হয়ে
উড়ে যায় অনন্তের দিকে।
তোমার অনুপস্থিতি
একটা অচেনা রঙ,
যা চোখে ধরা পড়ে না,
তবু সব দৃশ্যকে বদলে দেয়।
সময় এখানে থেমে থাকে না,
বরং ভেঙে যায় কণায় কণায়
আর সেই ভাঙা সময়ের ফাঁকে
তুমি, এক অসমাপ্ত রেখা।
স্পর্শহীন এক স্পন্দন
নীরবে ছড়িয়ে পড়ে শিরায়,
যেন ধুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে
এক অজানা আকর্ষণ।
আমি কি তোমায় খুঁজি?
নাকি হারিয়ে যাই তোমার মধ্যেই
যেখানে বুকের ভেতর উড়ে বেড়ানো ধুলো
হয়ে ওঠে প্রেমের একমাত্র ভাষা।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো-৩

বুকের ভেতর উড়ছে ধুলো,
তোমার নামের নিঃশব্দ ঝড়ে
পুরনো দিনের ভাঙা সেতু
আজও কাঁপে স্মৃতির তরে।
চোখের কোণে রোদের মতো
লেগে থাকে তোমার ছায়া,
দূর আকাশে হারিয়ে গিয়েও
ফিরে আসো নীলের মায়া।
অপ্রকাশিত কথার ভিড়ে
থেমে থাকে হৃদয়খানি,
তোমায় বলার সাহস জোটে না
তবু তুমি আমারই জানি।
রাতের শেষে ভোরের মতো
আলোর ছোঁয়া দাও নিঃশ্বাসে,
ধুলোর মাঝে ফুটে ওঠে
প্রেম…নীরব এক উচ্ছ্বাসে।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো – ৪

বুকের গহ্বরে এক অণুবীক্ষণিক ঝড়
ধুলো নয়, যেন ভাঙা সময়ের পরাগ,
অস্তিত্বের বিপরীতমুখী সমীকরণে
তোমার নাম এক অনির্ণেয় চলক।
নির্বাক স্পন্দনের ভিতর
শূন্যতা নিজেকে গুণ করে যায়
ফলে জন্ম নেয় এক অনুপস্থিত উপস্থিতি,
যেখানে তুমি আছো, অথচ নেই।
অর্থেরা এখানে আত্মহত্যা করে,
বাক্য ভেঙে পড়ে অক্ষরের আগেই
আমি শুধু দেখি,
চিহ্নহীন এক ভাষার অবক্ষেপ।
তোমার স্মৃতি
একটি অসম্ভব সরলরেখা,
যেখানে সব রেখা বৃত্ত হতে চায়,
আর সব কেন্দ্র হারায় নিজস্বতা।
বুকের ভেতর উড়তে থাকা ধুলো
শেষ পর্যন্ত আর ধুলো থাকে না
তা হয়ে ওঠে এক প্রাক-প্রেমিক বিশৃঙ্খলা,
যেখানে অনুভূতি নিজেকেই বুঝতে অস্বীকার করে।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো – ৫

বুকের অন্তঃপুরে গোপন এক যজ্ঞ,
ধুলো নয়,প্রাচীন মন্ত্রের ছাই,
যেখানে তোমার নাম উচ্চারিত হয়
নির্বাক আগুনের জিহ্বায়।
শিরার ভিতর ঘুরে বেড়ায়
অলিখিত কোনো তন্ত্রলিপি,
আমি পাঠোদ্ধার করতে গেলে
অর্থ পালায় ছায়ার মতো।
তুমি…
নক্ষত্রেরও পূর্ববর্তী কোনো সংকেত,
যার ইশারায় সময় নিজেই
নিজেকে ভেঙে ফেলে পুনর্জন্মে।
বুকের ধুলো উড়ে গিয়ে
আঁকে অদৃশ্য মণ্ডল,
তার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে থাকে
অপরিচিত এক তুমি,অচেনা অথচ অন্তরঙ্গ।
আমি কি উপাসক,
নাকি এই রহস্যেরই অংশ?
জানি না…
শুধু অনুভব করি,
এই উড়ে যাওয়া ধুলোর ভেতরেই
লুকিয়ে আছে প্রেমের গুপ্ত ব্রহ্মাণ্ড।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো–-৬

যে ভালোবাসা অকারণে ছিল, তা আর কাম্য নয়, ফেরার আকাঙ্ক্ষাও এখন অতীত। মনোবনের গভীরে জমে থাকা বহু পুরোনো স্মৃতি আজ ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দ। প্রতিটি স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত শিহরণ। বুকের গহীনে চৈতী জমিনের চিৎকার আর শুষ্ক মাটির নীরব আর্তনাদ কেবলই বাতাসে মিশে যেতে চায়।
বিদীর্ণ ভালোবাসার কোনো প্রয়োজন আর নেই। যে প্রেম হৃদয় ভেঙে অন্ধকারে স্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেছে, তা দূরে থাকাই শ্রেয়। হৃদয়ের ভূমিতে একসময় আশার ফসল ছিল, ভাবনায় ছিল শুদ্ধ চন্দ্রিমার আলোয় দুজনার নীরব পথচলা। কিন্তু সব রঙ আজ মুছে গেছে, সব মিলন অপূর্ণ রয়ে গেছে। প্রিয় মানুষটি আজ আর সেই চেনা রূপে নেই; কামনার সেই প্রতিচ্ছবিও আজ বিলীন।
ভালোবাসার শুভ্র আঁচল আর কাম্য নয়। আজ কেবলই মুক্তির আনন্দ। নীলিমার অসীম আকাশে ডানা মেলা এক মুক্ত বিহঙ্গ হওয়ার সাধ পূর্ণ হয়েছে। হাসিমুখের আনন্দময় এক পাখির জীবন আজ ধ্রুব সত্য। মনের খাঁচায় কেবল স্মৃতিটুকু থাক,বাকি আকাশ, বাতাস আর পূর্ণ মুক্তি থাকুক একান্তই নিজের অধিকারে। প্রতিটি শ্বাসে আজ কেবলই স্বকীয়তার জয়গান।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো -৭

বহুদিন খোলা হয়নি এমন এক ঘর, যেখানে সময় স্তরে স্তরে জমে থেকে নিজেরই ওজন ভুলে গেছে। বাতাস নেই, তবু হালকা এক সঞ্চালন ঘটে,অদৃশ্য কোনো স্পন্দনে ধুলোকণারা ভেসে ওঠে, আবার বসে পড়ে, আবার ওঠে।কোথাও কোনো নাম নেই, কোনো মুখও নয়, তবু অনুপস্থিতির এক নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। দেয়ালগুলো মনে হয় শুনতে পায়, কিন্তু কিছুই ফিরিয়ে দেয় না। শব্দেরা জন্ম নেওয়ার আগেই ভেঙে যায়, আর সেই ভাঙনের গুঁড়ো মিশে যায় এই উড়ে যাওয়া ধুলোর সঙ্গে।মাঝে মাঝে মনে হয়, এই ধুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বহু অপ্রকাশিত স্পর্শ, অগণিত না বলা বাক্য, আর অচেনা কোনো আকাঙ্ক্ষার ছায়া। সবকিছু স্পষ্ট হওয়ার আগেই আবার ঝাপসা হয়ে যায়,যেন পরিষ্কার হওয়াটাই এখানে অনুচিত।বুকের এই ভিতরটা ধীরে ধীরে এক বিস্মৃত মানচিত্র হয়ে ওঠে, যেখানে পথ আছে কিন্তু গন্তব্য নেই, দিক আছে কিন্তু দিশা নেই। আর সেই মানচিত্রের ওপর নিরন্তর উড়ে চলে ধুলো,অর্থহীন নয়, কিন্তু অর্থের বাইরে এক দীর্ঘ স্থির, অনিবার্য অনুভব হয়ে।



বুকের ভেতর উড়ছে ধুলো, অশান্ত দোলায়,
অচেনা এক শূন্যতা আজ আপন মনে জ্বালায়।
ভাঙা কিছু স্বপ্ন এসে বসে থাকে কোণে,
অপ্রকাশিত শব্দগুলো হারায় গোপন বনে।
দেয়ালজুড়ে ছায়ার খেলা, আলো ম্লান হয় মায়ায়,
অন্তর্গত সব অনুভব ধুলোর সাথে ভেসে যায়।
সময়ের এই ক্ষয়িষ্ণু ঢেউ থামে না কোনো কালে,
বুকের ভেতর জমে থাকা কথা ঝরে নির্জ্বালে।
তবু সেই উড়ে যাওয়া ধুলো আঁকে গোপন ছন্দ,
অন্তরালের নীরবতায় বয়ে আনে প্রেমের বন্ধ।

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো-৯

বুকের ভিতর উড়ছে ধুলো, স্মৃতিরা সব অবাধ্য ঘোড়া,
অন্ধকারে নক্ষত্রেরা খসে’ পড়ে তোমার চোখের ছায়ায়।
হৃদয়ের ভাঙা আয়নায় প্রতিফলিত হয় এক অশরীরী শহর,
যেখানে বাতাসের গন্ধে মিশে আছে তোমার বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস।

আমরা সময়ের কাঁটা ছিঁড়ে হেঁটে চলি শূন্যতার পথে,
একটি রুদ্ধ দুয়ারের ওপারে জমে আছে অগণিত অব্যক্ত কথা।
জ্বলন্ত মোমবাতি নিভে যায় হিমেল হাওয়ার দীর্ঘ স্পর্শে,
অস্তিত্বের ক্যানভাসে এঁকে যাই তোমার নামহীন প্রতিচ্ছবি।

এখন বিরহের বন্দরে নোঙর ফেলেছি নির্জন কোনো রাতে,
স্মৃতির আঙিনায় বিষাদ জমেছে, মুছে ফেলেছি সব হাতে।


আরো পড়ুন....

গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতা এখানে
ইলিয়াস মাহমুদের প্রবন্ধ এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা এখানে
কালরাতের কালো গল্প পড়ুন এখানে 
ঢাকার আঞ্চলিক কবিতা পড়ুন এখানে
অন্ধকারের বোতাম খুলে পড়ুন এখানে
প্রকান্ড ও ক্ষুদ্র অহংকারের বিরুদ্ধে পড়ুন এখানে
সাহিত্য আড্ডা নিয়ে রিভিউ পড়ুন এখানো
এসডি সুব্রত'র বই ও কবিতা পড়ুন এখানে
অনিন্দ জসীম এর বই ও কবিতা পড়ুন এখানে

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন