দুর্গাপুরের নিমসহিত্য আন্দোলন
জয়ন্ত দত্ত
নিমসাহিত্য আন্দোলন ভারতের দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।মাত্র ছয়জন লেখকের হাত দিয়ে।যা পরবর্তীকালে ত্রিপুরা আসাম সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইস্পাত কারখানা মানে বিশাল ভয়ংকর যন্ত্রদানবের রাজ্যপাট।গোটাকয়েক গ্রাম,পুকুর , টিলা ধানমাঠ,বন - জঙ্গল সব চলে যায় তার পেটে ফার্নেসের ১২০০ ডিগ্রির লাল হাঁ,রোলিং মিলের মৃত্যুদাঁত,অ্যাসিড ট্যাঙ্কের পুকুর প্রতিমুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে।নাইটশিফট ডিউটিতে সারা পৃথিবী যখন ঘুমের স্বপ্নরাজ্যে,তখন এই ছ'জন না - লেখকের ক্লান্তি অস্তিত্ব পিষ্ট হয় ধোঁয়া - ধুলো - গ্যাস আর ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উত্তাপে দিন দিন প্রতিদিন। তাঁরা পালাতে পারেনা।কারণ মৃত্যুর এই ভয়ংকর মুখব্যাদনই ছিল তাঁদের সিকিউরিটি তথা ক্ষুধা নিরসনের বন্ডেড শর্ত।
এই রুক্ষতা ক্ষোভ বিদ্বেষের একটা ভেন্টিলেশন চাই যেমন হাড়গিলে চাষা রাগে পিষে মারতে পারে বড় জোর ক্ষোভের কিছু পিঁপড়ে।ভুখা শ্রমিক ক্ষোভে পেটাতে পারে একমাত্র রোগা বউকে ।কিন্তু সেই ছ'জন লেখক ইস্পাত কারখানাকে শায়েস্তা করতে গিয়ে প্রথাগত সাহিত্যের ড্রয়িংরুম তছনছ করলেন ভাষাকে রোলে চিড়েচ্যাপ্টা করে,খেলো ধোঁয়াটে অন্যের যাপন - নামতাকে সুর করে বলার বদলে নিজেদের আর্তনাদকে নিজেদের মূল্যবোধের ওপর গেঁথে তুলতে,সৃষ্টি করলেন এক নতুন পরাভাষা,নতুন পরাবয়ন ,নিজস্ব পরাজগৎ।যা হল - না সাহিত্য অল্প - সাহিত্য ,তিক্ত - বিরক্ত সাহিত্য বা ' নিমসাহিত্য ' ।নিমসাহিত্যের একটি ক্যাপশন - ' জীবনের কোনো ধর্ম নেই - কার্যকারণের কোনো ব্যাখ্যা নেই।যা কিছু স্রেফ ধাঁধা চারপাশ জুড়ে এই বিশাল সিস্টেমেটিক চলমানতার বিরুদ্ধে নেটিভ নিম - লেখকরা ছিল অসম শক্তি।ফলে,এই আপ্তবাক্যটি দিয়ে সিস্টেমকে আঘাত করতে তারা আর কিছু না পেরে ভেন্টিলেশন হিসেবে নিম - লেখাকেই হাতিয়ার করেছিলেন।
অর্থাৎ তারা বন্ড দিয়েছিলেন ,এই ইস্পাত কারখানার বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক সিস্টেম,এই পেশাগত মৃত্যুভয় তাদের সত্তাজিজ্ঞাসায় তারা নিজেদের বদলে নেবেন।প্রথমে একই কারখানায় কাজ করলেও ,তারা কেউ কাউকে চিনতেন না।লিখতেন টুকটাক গৃহস্থ অভিজ্ঞতার অভিধাবলী।কিন্তু পেশাগত এই যন্ত্রণা তাদের ধীরে ধীরে এক বছরের মধ্যেই একত্রিত করে ফেলে ।রবীন্দ্র গুহ,সুধাংশু সেন,বিমান চট্টোপাধ্যায়,অজয় নন্দী মজুমদার,নৃসিংহ রায়,মৃণাল বণিক -- এঁরা একে অপরের ক্ষোভ ,রাগ দেখে বুঝে যায় তা একই জাতের।অর্থাৎ আইনসম্মত মৃত্যুভয়!
সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি,সমাজনীতি,অর্থনীতিতে এল এক অস্থিরতা।শুরু হল।কিছু একটা পরিবর্তনের সৃয়মান যুগসন্ধিক্ষণ।নিম - লেখকরা লেখা শুরুর অনেক আগে থেকেই একটা সন্দেহ বহন করছিলেন দীর্ঘদিন চলে আসা সাহিত্য সম্পর্কে।মানুষের অবয়ব কি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে?জীবনের মূল্যবোধে কোনো নির্দিষ্ট ধরণই পাওয়া যাচ্ছে না।বক্তার অন্তঃসার গল্পের ছক ক্লান্ত ধস্ত শব্দে তৈরি বোঁটকা অক্ষরের পাহাড়।নির্মাণের ছলাকলা শুধু?আর এই সন্দেহ থেকেই নিম - লেখকদের এল জগৎ ও জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধা। আর এই সুযোগে Scienticism অনেকটাই আকৃষ্ট করলো তাদের।
নিম লেখকদের প্রাক - নিম আন্দোলনের পড়াশুনায় কখনো অ্যাংরি বা বিট জেনারেশনের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।যা ছিল, তা একই দেশ,জাতি,জলবায়ু ও রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে জীবনযাপনের মিল হাংরি লেখকদের সঙ্গে।ফলে নিম আন্দোলনের Principal provoking factor যদি হয় ' ইস্পাত কারখানার জীবসত্তা ', তবে Auxilary facror ছিল হাংরিদের যাপিত এই ভূখণ্ডের অন্যান্য প্রেক্ষিতসকল।এছাড়াও নিম লেখা - লেখির মধ্যে অ্যাংরি বিট ধাঁচের মনন - প্রক্রিয়ার উপস্থিতি কিছু কিছু টের পাওয়া যায়।নিম - লেখকদের লেখায় কলকারখানার নতুন টেকনো - শব্দ,টেকনো - টেক্সচার,নতুন টেকনো - উপমা,নতুন টেকনো - ফর্ম, যা আগে কখনোই বাংলা লেখায় দেখা যায়নি।
এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন নিমসাহিত্য কি ও কেন? নিমসাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক বিমান চট্টোপাধ্যায় মহাশয় এ বিষয়ে ব্যাখা করেছেন বিভিন্ন বইয়ে। নিমসাহিত্য কোনো তথাকথিত সাহিত্য বা নাদুসাহিত্য নয়।নিমসাহিত্য একটি জীবন্ত মনুষ্য শরীরের জীবনযাপনের,সেই শরীরের মুহুর্মুহু মানসিক অবস্থানের,সেই শরীরের বিচিত্র এবং নানা অনুভূতির,সেই শরীরজাত সুস্থ প্রলাপ, বাণীরূপ,গর্জন,হুঙ্কার,হাসি - কান্না যন্ত্রণার এক একটি উলঙ্গ উচ্চারণ।এমন উচ্চারণে শব্দ ব্যবহার বা ভাষা এক স্বাধীন মুক্তাঞ্চল এর অধিবাসী।
মরজগতের মানুষের যাবতীয় মনন প্রক্রিয়ার সমস্ত উচ্চারণই নিমসাহিত্যের আওতাভুক্ত।সেই মনন - প্রক্রিয়ার উচ্চারণ হতে পারে কখনও সুরিয়ালিস্টিক, কখনো ফ্যান্টাসি,কখনও স্বপ্নচারণা, কখনো ইমেজিস্ট,কখনও ম্যাজিক - রিয়ালিটি, কখনো শবদেহজাত আত্মার খুব কাছাকাছি।অর্থাৎ পরলোকযাপনের অনুভূতি।অথবা আসতে পারে মনস্তত্ত্বের নানা উচ্চারণ।এমনকি ১০৬ ডিগ্রি জ্বরের ডিলিরিয়াম কখনো মানুষের অবচেতনের উচ্চারণ হয়ে উঠে এসে এক শৃঙ্খলাহীন ' না - সাহিত্য ' এবং রূপ নিতে পারে।কি আসবে আর আসবে না - নিমলেখক নিজেই তা জ্ঞানত অবহিত নন।নিমলেখক শুধুই উপভোগ করেন উচ্চারণের চরম স্বাধীনতা।
তাদের খাওয়া ঘুম ,আড্ডা, বহেমিয়ানিজম,Politics of knowledge,Politics of choice, Politics of change ইত্যাদিতে শুরু হল একটা গুড়গুড় কম্পন।মনের রিখটার স্কেলে একজনের কম্পন অন্যজন পরিষ্কার পড়ে ফেলে তারা বোঝেন,এই কম্পনের ফল -- বিনির্মাণ।অথবা, ভাঙচুর অবশ্যম্ভাবী।তারা চেয়েছিলেন এই বিনির্মাণ। সেটা কি এবং কিভাবে ,তখন তাদের জানা ছিল না।সেদিন তারা চেয়েছিলেন - শব্দ শুধু জ্ঞানের আধার হবে কেন? এই উপলব্ধি থেকে মুক্তি চাই।তারা উপলব্ধি করলেন -- চেতন অবচেতনের যে শাব্দিকতা ও নৈঃশব্দের নিরবচ্ছিন্ন অন্তর্বয়ন,তার থেকে গড়ে ওঠা যে বয়ান, তা কেন লেখা হবে না?বস্তুস্বরূপের অনুভূতি কি চাপা থাকবে শুধু বস্তুর বহিরঙ্গ জ্ঞানে?তখন থেকেই তাদের মত করে তারা উচ্চারণ করলেন,তাদের নিজস্ব সাহিত্য -- না সাহিত্য অল্প সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য -- নিমসাহিত্য।
অর্থাৎ নিমসাহিত্যের সার্বভৌমত্বে ঢুকতে গেলে তিনটি গেটওয়ে --১)না - সাহিত্য ২) অল্প - সাহিত্য ৩)তিক্তবিরক্ত সাহিত্য।যেকোনো গেট দিয়েই প্রবেশ হোক না কেন -- কেন্দ্রবিন্দু নিম সাহিত্য পৌঁছনো যাবেই।
শিল্পাঞ্চলের লালদুর্গ দুর্গাপুর টাউনশিপে ৭/৬ শর্ট রোড হয়ে উঠল নিম সাহিত্যের ঘাঁটি।কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল এইভাবে - মেরুদন্ড :সুধাংশু সেন,পাকস্থলী : রবীন্দ্র গুহ,নাভিমূল :বিমান চট্টোপাধ্যায়,ফুসফুস:মৃণাল বণিক, কণ্ঠাস্থি :নৃসিংহ রায়, নিতম্বাস্থি:অজয় নন্দী মজুমদার।আসানসোল থেকে উদয়ন ঘোষ এসে একদিন বললেন,'আমিও আছি। মনুষ্যতন্ত্র গদ্য চাই।শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনাই আমার প্রথম শর্ত।' এলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় রূপনারায়ণপুর থেকে।বললেন, ' আমিও আছি।বাংলা ভাষার প্রবহমান স্রোতধারা অন্যখাতে প্রবাহিত করার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন নয় -- প্রতিস্পর্ধীও নয় '।কলকাতা থেকে এলেন শংকর চট্টোপাধ্যায়,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,সুবিমল বসাক, জামশেদপুর থেকে বারীন ঘোষাল,কুচবিহার থেকে অরুণেশ ঘোষ। হাংরির সুবো আচার্য স্মরণযোগ্য নিমবাক্য লিখলেন।আরো অনেকে এলেন গণেশ সেন, রবীন সুর,প্রদীপ দাশ শর্মা,সুকৃতি বক্সী,তুষার চট্টোপাধ্যায়,অরুণ আইন,নিখিল বসু,সুভাষ ভট্টাচার্য,ক্ষিতীশ দেবশিকদার।শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিম সাহিত্যের লেখকদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন ,কিন্তু নিম সাহিত্যের জন্য কোনো লেখা বা চিঠি পাঠাননি।পাঠিয়েছিলেন একটি বিজ্ঞাপন।সঙ্গে ৫ টাকা।বিজ্ঞাপনটির বিষয় ছিল,' বাংলা কবিতার বকেয়া মিটিয়ে দিন।' শক্তির মতই মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী নিম সাহিত্যকে সমর্থন করেছিলেন।কিন্তু পত্রিকার জন্য কিছু লেখেননি।হয়তো হাংরি হাঙ্গামার দরুন যে হেনস্থা ,তার জন্য কোনো নতুন ঝামেলায় জড়াতে চাননি।বস্তুতই ,নিম সাহিত্য নিয়ে তখন সর্বত্র উত্তেজনা,তিক্ত আলোচনা।শোনা যায় ,শক্তি বাবু নিম সাহিত্য লুকিয়ে পড়তেন।অপবাদ রটেছিল নানারকম।নিম সাহিত্য অপ সাহিত্য,শিকড়হীন সাহিত্য,অনৈতিক সাহিত্য,স্টান্ট তথা চমকদার সাহিত্য বা নিম সাহিত্য আদৌ সাহিত্যই নয়।উৎপল কুমার বসুর মতো আরো অনেকেই নিম সাহিত্যকে পাত্তা দেননি।
নিম সাহিত্যের মূল বিষয় গুলি ছিল :
১) সাহিত্য অভিজ্ঞতার ফল নয়, অবিকৃত অভিজ্ঞতাই সাহিত্য।
২)জীবনের কোনও ব্যাখা নেই,কার্যকারণের ভবিষ্যৎ নেই।
৩)শিল্পহীনতার থেকে বন্ধনহীনতার দিকে।
৪)বোধের মূলে নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করুন।
৫)ব্যক্তিগত বিস্ফোরণ চাই।।
৬)নিম সাহিত্য একটি গাণিতিক চেতনা।সাহিত্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বদলকরণ।নতুন ব্যাকরণ।
৭)ব্যারেলের ওপর থেকে প্রজাপতিটি উড়িয়ে দিন।
৮)লেখক হওয়ার বাসনা জাগা মাত্রই আত্মহত্যা করুন।
৯)দুঃসাহসিক শাব্দিক বৈভব,বোধচর্চিত শ্লেষ জীবনের যাবতীয় ধোঁয়া ধুলোর কথাই সাহিত্য।
১০)এই মুহূর্তে চাই গদ্যের উল্লম্ফন,বিতর্ক ব্যঙ্গ,বিভৎস বক্রোক্তি।
১১) মানব আত্মা + দৃশ্য জগতের আত্মা = কবিতা।কবি ঈশ্বরের সমগোত্রীয়।
১২)জীবনের প্রায় সবকিছুই তছনছ।এখন চাই আত্মিকদ্বিধাদ্বন্দ সঙ্গম সংঘর্ষ -- এবং তদজ্জনিত রক্তক্ষরণের পুনরালোচনা।
১৩)নিম লেখকদের অস্তিত্ব অবিরাম হা - হা আর্তনাদ। তাঁরা ঘিলুর ফাঙস সাফ করতে চান । তাঁদের রক্তে টগবগ করে ফোটে ভালবাসা। তাঁরা বিশ্বাস করেন শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হামেশাই বদল করে ।
১৪)জগতের যাবতীয় বিষয় সম্পদের ওপর মানুষ ও কীট পতঙ্গের সমান অধিকার।
১৫) তত্ত্ব বিতরণ নয়,তৈরি হোক জীবনের শব্দজোট।বিবেক + আত্মা + হৃদয়।
নিম লেখকদের মধ্যে অন্তত দুজন তরুণ তুর্কী ছিলেন।মৃণাল বণিক এবং বিমান চট্টোপাধ্যায়।অনুভবের জগত,বুকের স্পন্দন।নিরীক্ষামূলক মগজ যদিও সুধাংশু সেনের প্রখর ছিল।কিন্তু সুধাংশু বাবু ছিলেন শান্ত ধীর উদার। তাঁকে অন্যান্যরা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জ্ঞান করতেন।
সুধাংশু সেন কখনো কারো প্রতি বে - আক্কেলে মন্তব্য করতেন না। এঁরা বরাবরই বলতেন :" নিম সাহিত্য লার্জ স্কেল সাহিত্য নয় , আবসলুট সাহিত্যও নয়।নিম সাহিত্য অ্যাজ সাচ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড এক্সপোজার - মৃত্যু সম্পর্কিত,দুঃখ সম্পর্কিত,প্রেম সম্পর্কিত,হিংসা সম্পর্কিত।পারিপার্শ্বিক সমস্ত মূল্যবোধ ভেঙে পাপপূণ্য কে অগ্রাহ্য করে নিম সাহিত্যের মূল্যায়ন।ইহা অত্যুত্তম জীবনের জন্য অ্যাবসলিউ টলি সেনসারি।'
হাংরি এবং শাস্ত্রবিরোধীদের পৌনঃ পুনিকতা থেকে না - সাহিত্য অল্প - সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন - অতিষ্ঠ অস্তিত্বের প্রাণবায়ু।
নিম লেখকেরা যথেষ্ট ভেবে চিন্তে একটি ছক তৈরি করলেন।সেটা ফের খচিয়ে দিল কলকাতার মসিহস্তীদের।ছকটা আগুন জ্বালিয়ে দিল সুতানুটি গোবিন্দপুরে।১ নং সুতারকিন স্ট্রিট ক্রোধে ফেটে পড়ল।চুনোপুটি দের লেলিয়ে দিল আর মসিহস্তীরা ছুটলো লালবাজারে।
হাংরি এবং শাস্ত্র বিরোধীদের পৌনঃপুনিকতা থেকে না - সাহিত্য অল্প সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন - অতিষ্ঠ অস্তিত্বের প্রাণবায়ু। এঁরা তৎকালীন,অর্থাৎ সত্তরের সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জ্যামিতিক নকশাও বানিয়েছিলেন।এই নিম - নকশা নিয়ে তখনকার বাংলা বাজারে লেখক মহলে খুব ধামাকা হয়েছিল।কফি হাউসে হাতাহাতি,ইস্পাত কারখানার গেটে পোস্টার: 'সাহিত্যের অতীত মৃত।এখন আমাদের নিয়ে সাহিত্য তিক্তবিরক্ত সাহিত্য নিম সাহিত্য।সমুদয় মৃত সাহিত্যকে আসুন জ্বালিয়ে দিই।'
ঘনঘন টেলিফোন আর তারবার্তা গেল দুর্গাপুরে। পুলিশী তহকিকাৎ আর পার্টির ধমকানি শুরু হয়ে গেল। কালো ভ্যান আসে আর ধমক দিয়ে ফিরে যায়।বারবার আসে।কখনও রবীন্দ্র গুহ,কখনও সুধাংশু সেন কিম্বা বিমান চট্টোপাধ্যায় এর বাড়ি।খোঁজ নিয়ে জানা গেল এসব কান্ড সূতারকিন স্ট্রিটের মসিহস্তীদের মাথা থেকে বেরোচ্ছে। নাটের গুরু হলেন উদার স্নেহশীল সাগরময় ঘোষ। বেঁটেখাটো লোকটির পিঠের ওপর মস্তবড় একটা থলে।থলের ভেতর উঁকিঝুঁকি মারে জবর জবর মুন্ডু।একটি মুন্ডু বিমল করের,একটি সমরেশ বসুর,একটি গৌর কিশোর ঘোষের ,একটি সন্তোষ কুমার ঘোষের ,একটি সুনন্দর।সর্বকনিষ্ঠ মাথাটি ছিল সুনীল গাঙ্গুলির ।আরো অনেক নামী মাথা ও মুন্ডু -- যেমন নীরদ সি চৌধুরী,বুদ্ধদেব বসু ,সৈয়দ মুজতবা আলী।
এভাবে নিম সাহিত্যের স্রোত স্টিল সিটি থেকে জব চার্ণকের মহানগর পর্যন্ত গড়িয়ে গেল সাহিত্যের ঘাঁটিগুলিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটল। গঙ্গা পেরোতে পারলেন না বিমান চট্টোপাধ্যায়।রবীন্দ্র গুহ বিতাড়িত হলেন কলেজ স্ট্রিট থেকে।বাড়ির সামনে পুলিশের কালো ভ্যান।
নিম সাহিত্যের পর আর কিছু হয় না ---
একথা বোঝানো হল আনন্দ বাগচী, তারাপদ রায়,বরেন গঙ্গোপাধ্যায় ,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে।উদয়ন ঘোষ সবথেকে বেশি আস্ফালন করলেন।এমনকি লিখিলেশ ও সুনীল গাঙ্গুলিকে নিয়ে একটা গল্পও লিখে ফেললেন।কে এই নিখিলেশ?খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সুনীল গাঙ্গুলির সাথে তার বন্ধুত্ব আছে।এই নিখিলেশ শিল্পাঞ্চলের । তাঁর মগজটি নিমসাহিত্যের।
যাই হোক নিম সাহিত্য করার শুরুতেই লেখকেরা মেনে নিয়েছিলেন শব্দের সংকরায়ণ একটি জরুরি ব্যাপার।শব্দ বানানোর জন্য যেকোনো ভাষা থেকে মাল মশলা নেওয়া যেতে পারে।বাংলা নয় এমন শব্দও বাংলার পাশে স্থান করে নিতে পারে।সম্ভবত এই কারণেই বঙ্গভাষা বাবু মানসে খুব ব্যথা লেগেছিল।ভাষার প্রতি খরদৃষ্টি এবং জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক আছে এমন দুজন বাকসফল লেখক সতীনাথ ভাদুড়ী ও কমলকুমার মজুমদার এঁদের চিন্তা চেতনার খুব কাছাকাছি ছিলেন।
এবার দেখা যাক নিম লেখকেরা কী ধরনের সাহিত্য প্রচেষ্টা করেছিলেন।প্রথমত রবীন্দ্র গুহর ' ঝুঁপড়ি '। তাঁর ক্ষিপ্ত টালমাটাল নিম উপন্যাস , ' নাভিকুন্ড ঘিরে "।
মৃণাল বণিকের শিল্পায়ন ভিত্তিক গররাজি গল্প ' মানুষ মর্কটমচ্ছব ',বিমান চট্টোপাধ্যায় এর তিক্ত বিরক্ত গল্প ' প্রথম সমীকরণ ', নৃসিংহ রায়ের না - গল্প ' বর্তমান পুরুষ ',নন্দ চৌধুরীর অল্পস্বল্প গল্প ' সুখের পায়রা ',সুধাংশু সেনের হরাইজেন্টাল কবিতা ' আদিখ্যেতা ',এবং তাঁরই না - প্রবন্ধ না - আলোচনা ' নকশী কাঁথা ফানুস ও অস্ত্রশস্ত্র '।
কিন্তু,যেহেতু কলকাতার একশো আশি কিলোমিটার দূরে থেকে সাহিত্যে মুক্কা বা ঘুষি মেরে ভূকম্পন তোলা যায় না।সুতরাং পাঁজরে ঘি মালিশ না করে রক্তে কব্জি ডোবালেন নিম লেখকেরা।অতিরিক্ত স্লোগান থাকল:
১) জীবনকে অষ্টপ্রহর বিব্রত করো। রক্তমোচনই মোক্ষ।শাশ্বত।
২)না - গল্প,না - কবিতাই সাহিত্যের মূল্যমান।স্থানিকতা প্রশ্রয়ী কার্যক্রম।
৩)সাহিত্যে বৃহৎ বিষয় বলে কিছু নেই।
৪)যৌনতাই যথার্থ হৃদয়বত্তা।ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সাবধান।
মূলত সুধাংশু সেন ছিলেন নিম সাহিত্যের প্রধান সম্পাদক,জঙ্গল সাফ করার প্রধান সেনাপতি রবীন্দ্র গুহ + বিমান চট্টোপাধ্যায়+ মৃণাল বণিক + অজয় নন্দী মজুমদার + নৃসিংহ রায়। এঁরা সকলে মিলে একসঙ্গে নিমসাহিত্যে জিভের ভাষা শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করলেন ।বানান - ফানানের ব্যকরণ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন।শব্দ গঠনে জিভের টোন আনলেন।পদে পদে সাধু ভাষার সঙ্গে চলতি ভাষার মিশ্রণ।উপরন্তু কমল মজুমদারীয় অ্যারিস্ট্রক্রেসি।নিম সাহিত্যের আমল থেকেই ভাষায় ছুয়াছুৎ না মানার জিদ শুরু।সাহিত্যে ছিলকে - চটা ভাষা যাদের নিপীড়ন করে তারা সৎ পাঠক নয়।
সব শেষে বলা যায় সমকাল বা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের উপর নিম সাহিত্য কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছিল।প্রায় চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর আগে কিছু কিছু তরুণ লেখকের লেখায় প্রথা ভাঙার ধাঁচ,প্রতিবাদ ,নতুন ফর্ম খোঁজার চেষ্টা ,কিছু শব্দকে বিকল্পভাব প্রকাশের কাজে ব্যবহার - un conventional ক্রাফট ,বক্তব্যে লজিক্যাল ক্র্যাক,মালটি ডাইরেকশনাল গতি ইত্যাদি লক্ষ করা গিয়েছিল।দুই দশক ধরে এবং এখনো হাংরি চর্চা ও নিম চর্চা ধারাবাহিকভাবে বহমান ।নতুন শতকের পর থেকে নিম নিয়ে এই প্রজন্মের তীব্র কৌতূহল প্রকাশ পাচ্ছে।দুহাজার সালের পর থেকে নিম সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রচুর লেখা হচ্ছে ।কেউ কেউ নিম - গবেষণায় পি এইচ ডি করছেন।
অসাধারণ নিম - দলিল করে প্রয়াত হয়েছেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় কবি অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় (২০০৩)।তারপর আলোর পাখি (২০০৫),অভিমুখ (২০১৫),কবি সম্মেলন ,তথ্য সংস্কৃতি(২০১০),বিকল্প শরীর (২০০৮),সপর্যা(২০০৮),গল্পবিশ্ব (২০০৮),নবাবী(২০০৩,২০০৪),বাংলা সাহিত্য আন্দোলন(২০১৪) ,এছাড়াও আরো অনেক পত্র পত্রিকা আছে ।
সবশেষে বলা যায় ভাষা বা ফর্মে নিমকে দেখে - পড়ে অনেকেই সাহসী হয়েছেন।যা তাদের লেখায় ফুটে উঠছে। বিষয় ভাবনা ও লেখালেখিতে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র:
১) নিমসাহিত্য সংকলন:সৌম্যব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
২) রবীন্দ্র গুহ, কালবৃত্তের বাইরে স্বনির্বাসিত এক যুবরাজ: অজিত রায়।
আরো পড়ুন.....
নিরাঞ্জন রায়ের কবিতা পড়ুন এখানে
শ্রমিক দিবসের কবিতা পড়ুন এখানে
মে দিবসের কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
আবদুর রাজ্জাকের কবিতা পড়ুন এখানে
অনিক খুরশীদের পড়ুন এখানে
চরু হক এর কবিতা পড়ুন এখানে
প্রেমাাংশু শ্রাবণের কবিতা পড়ুন এখানে
সোমা দে'র নিবন্ধ পড়ুন এখানে
সিকান্দার কবিরের কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদ্দীন এর কবিতা পড়ুন এখানে
আমিনুল ইসলামের কবিতা পড়ুন এখানে
জিল্লুর রহমান শুভ্র'র কবিতা পড়ুন
রেজাউদ্দিন স্টালিন এর কবিতা পড়ুন
শামসুর রাহমানের গদ্য পড়ুন
নয়ন আহমেদ এর কবিতা পড়ুন
ভাস্কর চৌধুরীর কবিতা পড়ুন
নববর্ষের গল্পগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের ছড়াগুচ্ছ পড়ুন এখানে
নববর্ষের গদ্য পড়ুন এখানে
নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা পড়ুন এখানে
স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা।।২৬ ছড়া পর্ব এখানে পড়ুন
ঈদ সংখ্যা।।২৬ প্রবন্ধ পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ গল্প পর্ব পড়ুন এখানে
ঈদ সংখ্যা/২৬ কবিতা পর্ব পড়ুন একানে
অনন্ত পৃথ্বীরাজ এর রোমান্টিক কবিতা পড়ুন
একুশের একগুচ্ছ কবিতা পড়ুন এখানে
দুলাল সরকার এর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
খৈয়াম কাদেরের কবিতা পড়ুন এখানে
মাহবুবার করিমের কবিতার পড়ুন এখানে
খসরু পারভেজের কবিতা পড়ুন এখানে
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে
বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা পড়ুন এখানে
নাগিব মাহফুজ এর উপন্যাস ভিখারি পড়ুন এখানে
কবি আমিনুল ইসলামের দারুণ কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদদ্ীন লোদীর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
রোকসানা ইয়াসমিন মণির কবিতা পড়ুন এখানে
মতিন বৈরাগীর কবিতা এখানে পড়ুন
মাসুদ মুস্তাফিজের কবিতা পড়ুন এখানে
অমিত চক্রবর্তীর কবিতা পড়ুন এখানে
বড় ও বিখ্যাত কবির কবিতা পড়ুন এখানে
জিয়াবুল ইবন এর কবিতা পড়ুন এখানে
কাজুও ইশিরোগুরের উপন্যাস বিশ্লেষন প্রবন্ধ পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks