রাহমান ওয়াহিদ এর ১০টি কবিতা
কোমল মাটিতে ফাটল
জলজ উদ্ভিদের মতো ভালোবাসা
দৃশ্যত ভাসমান
ওপরে জলের নিথর বিছানা
তবুও আশ্চর্য কম্পমান;
গহীন অতলে ঘটেছে কিনা অঘটন
দ্যাখো-হয় কিনা দৃশ্যমান।
যাও আরো, গভীরে যাও
দ্যাখো-বিশ্বাসের কোমল মাটিতে ফাটল,
ফেটে যাচ্ছে,সরে যাচ্ছে অটল
কোন অঙ্গিকার। জানো না তুমি,
টের পাচ্ছো না, টের পাচ্ছে ভূমি-
যেখানে শেকড় গেড়েছে প্রণয়
হয়তো ঘটছে সেখানেই গোপন প্রলয়।
দ্যাখো-ডুবছে উদ্ভিদ ভালোবাসা
নিচে আগ্রাসী ফাটামাটি,সর্বনাশা
শুষে নিচ্ছে সমস্ত কাঁপা কাঁপা জল
তুমি বিহ্বল চেয়ে চেয়ে দেখবে কেবল
যেমন এমনি করেই সারাটা জনম
দেখেছিল খাঁ পাড়ার মনীরা খানম।
অনিকেত বৃষ্টি ফোটা
আসলেই কিছু নেই। না শরীরে, না ফসিলে
পুরো মুখ জুড়ে চৈত্রের বিচূর্ণ দুপুর
বর্ষার ধুলোজল, কাদা, ভেতরে শীতার্ত ভালুক।
এলেই দেখতে পাবে দু’পায়ে এখনো লেগে আছে
আশ্বিনী পিছুটান।
নিমজ্জিত শরীরে যদিও সপলব বৃক্ষের সারি
তারও শেকড় ছুঁয়েছে হৎপিন্ডের হলুদ বাকল।
একদা যে জিহ্বায় অজস্র কথার সিম্ফনি ঝরেছিল
তা এখন কেবলি শিল্পিত পলিজ নদীতল।
দেখে নিতে পারো হৃদপটের ভিন্ন ক্যানভাসে
দুর্বোধ্য আঁকিবুঁকি, যদিও তা তোমার বোধের
ভেতরে জাগাবে অকাল তন্দ্রা-
দেখবে হয়তো বা প্রত্ম প্রেম, অনিকেত বৃষ্টি ফোঁটা,
যা তোমাকে অযথা এক মগ্ন নগ্নতায় তুমুল ভেজাবে।
অপুষ্পক বৃক্ষকোষে
মাঝে মধ্যে সরে যাই অস্তিত্বের শেকড় থেকে
ভুলে যাই পিতামহের দামি দামি প্রাচীন শ্লোক
এড়িয়ে যাই খুব দরকারি কিছু পিছুটান;কী যে হয়,
ভরা জোছনায় পানসে হয়ে ফোটে আনন্দলোক।
মাঝে মধ্যে অতলে গিয়ে দেখি ভরাট জলাধার
যেখানে তুমি বুক পানিতে নেমে মন ভেজাতে
বৈশাখী খোপা খুলে ছড়িয়ে দিতে প্রত্ন প্রণয়
যদিও বেহুলা ফাগুন এখনও একলা বসে কাঁদে।
নিজেকেও সরিয়ে দেখি-রুহহীন পরাস্ত শরীর
ঝাঁক ঝাঁক কাকেদের সে কী ডানা ঝাপটানো!
আহা,যদি কেউ বলে দিতো ফসলী মাঠটা কোথায়
রোদ নক্ষত্র চাষ করে যেতাম অপুষ্পক বৃক্ষকোষে।
সমুদ্রনীল মন্থনে যাবো
করতলে লুকোনো যে রহস্য বীজ
তাকে তুমি অঙ্কুরিত করো।
আমরা ঘাসপথ ছেড়ে পিচকালো মসৃণে যাবো
মরুর অরণ্য ছেড়ে সমুদ্র নীল মন্থনে যাবো।
প্রিয় সব হৃদ-মননে জন্মেছে যে বাদুড় কুয়াশা
তাকে তুমি উন্মোচিত করো।
আমরা মৃত চন্দন ছেড়ে সপ্রাণ জীবনে যাবো
কুর্নিশী খোলস ছেড়ে সৃষ্টির কঙ্কুরে যাবো।
শব্দের ভেতরেই যে নৈঃশব্দের ধুলিঝড়
তাকে তুমি দৃশ্যমান করো।
আমরা সমস্ত ক্ষরণ ছেড়ে চম্পক শুদ্ধতায় যাবো
সৃষ্টির কুহক ছেড়ে কাচস্বচ্ছ কর্নিয়ায় যাবো।
কতকাল জিভজলে পুড়ি না
কুহকী কোকিলের ডাকে মন্ত্রমুগ্ধ অসুস্থ বিকেল
মৃতেরা ঘুমচোখ খুলিতেছে বিমূঢ় বিষ্ময়ে
নীলকণ্ঠী মনীরার নীল ঠোঁটও অবলীলায়
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় অমৃতের অমূল্য তরল।
কতকাল দেখি না আহা,এমত অসুখের সুখ
কতকাল ঠোঁটের আগুনে ,জিভজলে পুড়ি না
আহা! কতকাল তাল বেতাল মৌতাতে মাতি না।
এখনও রক্তক্ষরণে কী দারুণ হিম ঝরনা বহে
বিবর্ণ সবুজেও তাজা ঘ্রাণ ছোটে,নহে মৃত নহে
আহা!,কী যে ভালো হয়,যদি মন আবারো জাগিবারে চাহে!
মরা গাঙ ভাসে না
রাত জেগেছে রাতের প্রহরে
জল নেমেছে জলের নহরে
কারা যেন যায় মন মোহনায়
দোলে দোল খায় মৃতের শহরে।
ডেকেছে শিশির ঘুম ভাঙ্গেনি
উড়েছে পাখি ডানা মেলেনি
সময় বেজেছে কখন যে কোথায়
সেইসব কেউ মনেও রাখেনি।
মন ভেঙেছে মনের অতলে
কেঁদেছে ভেতর ডোবেনি সজলে
নদী ভাঙে নাতো মরা গাঙ ভাসে
বিহঙ্গ জীবন ফিরে ফিরে আসে।
রঙমহলে মগ্ন মাকড়সা
একটা ঝড় উঠবে এক্ষুনি। ঝড় তা জানে না।
ভেতরের রঙমহলে মগ্ন মাকড়সা,সূতোর বুননে
স্বপ্নের দালান,
মেঘেদের কালো চোখে বিচ্ছুরণের দ্যুতি।
ঝড় তা জানে না।
আমি বোশেখী রগড় থেকে সবুজের তান্ডবে যাবো,
নদীর নগ্নতা থেকে জলজ স্বচ্ছতায় যাবো।
ঝড় তা জানে না। জানাটা বড় নয়।
কিন্তু ঝড়টা উঠবে এক্ষুনি।
অন্য এক সেই ঝড় কিছুই দোলাবে না,
উপড়াবে না লতাগুল্ম, ভূমিষ্ট শিশুদের নাড়িও ছিঁড়বে না;
শুধু চিৎকারে মথিত হবে চৈতালী মাঠ,
আর প্রাচীন কবর থেকে উঠে আসবে কিছু ভাঙা খুলি,
হাড় মজ্জা, নাভীমূল- যাদের দেহ থেকে নন্দিত হৃদয় কখনো
আলাদা ছিল না।
প্রতিপক্ষ যে পূর্ণিমা আকাশের
বরফ হিমেও তাকে আমরা মিঠে রোদ
নামাতে বলি না। বিপদ হয়। রোদের অহঙ্কারে
গোটা শহরকে পুড়িয়ে সে তখন
প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় পূর্ণিমা আকাশের।
তাকে আমরা কাছে থাকতেও বলি না।
কাছে থাকার মানেটা সে বোঝে-
আঁচলের সুতো হয়ে থাকা।
তাতে বিপদ হয়। নারীরা আঁচল ছেড়ে
অরণ্যে হাওয়া খেতে গেলে
সে-ও যত্রতত্র নক্ষত্রদের ছিন্ন ভিন্ন করে।
তাকে আমরা দূরে থাকতেও বলি না।
তার দূরে থাকা মানে উর্বর সময়ে ঘাপটি মেরে
বসে থাকা। তাতে বিপদ হয়।
তখন কর্ষণ ছেড়ে শূন্যতার মার্বেল ছুুড়তে থাকে সে
অঙ্কুরিত স্বপ্নের স্তম্ভের দিকে।
কী দিয়ে বেঁধেছিলে বাহুল্য সংসার
ছিল ঠিক এক সময়, কীই না ছিল এই সান্ধ্য যাপনে
রোদশাদা দুপুর ছিল,বিকেলের ঘুমঘুম ঘ্রাণ ছিল
টলটলে চোখজলের মায়াবী নিবেদন ছিল।
এখন তো এসব কিছু নেই, থাকেও না,তবু বারবার
কেন কুয়াশা ভেঙে শীস দাও দোয়েলের
কেন বিপন্ন বিমূর্ত ঘোরে ভ্রান্তির অবসাদ টেনে আনো।
তুমি তো জানতেই কী করে জলাধার থেকে নদী হয়
নদীপ্রেম থেকে সমুদ্র হলে,সে-ও যে উদাসী বাউল হয়
জানতেই তো এক জনমের ভালোবাসায় ফলে না মুক্তো কোন।
তাহলে কী পুষেছো তুমি এতকাল চোখের আকরে
কী দিয়ে বেঁধেছিলে বাহুল্য সংসার পারাবার-
কেন শুধু শব্দ পোড়াও,কেন অরণ্যছায়া অসুরে ওড়াও?
না থাকুক খোলা প্রেম বাহুডোর
আমার গন্তব্যগুলো বড় উল্টোমুখি।
চানখারপুল যেতে চাইলে চলে আসি
দক্ষিণ খানে। হিজলের ছায়া ছেড়ে
নীলখাম রোদে এলে
বেভুল জোছনাটা টেনে তোলে বাবুই ঘরে।
ধুলোয় লেপ্টে থাকা হৃদচিহ্ন চিরকুটে
কার যেন চোখজলে অস্ফূট লেখা-
আমারই নাম ধাম ধবল ঠিকানা-কোথা সে?
বিভ্রমে দেখি তার কালো নদী মোহনা।
ভুল পায়ে হেঁটে হেঁটে
কত আর এদিক সেদিক?
না থাকুক শয্যা কুসুম খোলাপ্রেম বাহুডোর
যাবো আমি ছিন্ন পাতায় ঘেরা তালপাখা ঘরে
কতকাল ফিরিনি হায়,কতকাল কতকাল ধরে...।
আরো পড়ুন......
সুনির্মল বসু'র গল্প পড়ুন এখানে
গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতা এখানে
ইলিয়াস মাহমুদের প্রবন্ধ এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা এখানে
কালরাতের কালো গল্প পড়ুন এখানে
ঢাকার আঞ্চলিক কবিতা পড়ুন এখানে
অন্ধকারের বোতাম খুলে পড়ুন এখানে
প্রকান্ড ও ক্ষুদ্র অহংকারের বিরুদ্ধে পড়ুন এখানে
সাহিত্য আড্ডা নিয়ে রিভিউ পড়ুন এখানো
এসডি সুব্রত'র বই ও কবিতা পড়ুন এখানে
অনিন্দ জসীম এর বই ও কবিতা পড়ুন এখানে
মিলন মাহমুদ এর কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
সাদমান সজীব এর মৃত্যুমৈথুন পড়ুন এখানে
মা দিবসের কবিতাসমূহ পড়ুন এখানে
রুদ্র সাহাদাৎ এর কবিতা পড়ুন এখানে
হাবিব হেলাল এর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
নিরাঞ্জন রায়ের কবিতা পড়ুন এখানে
শ্রমিক দিবসের কবিতা পড়ুন এখানে
মে দিবসের কবিতাগুচ্ছ পড়ুন এখানে
আবদুর রাজ্জাকের কবিতা পড়ুন এখানে
অনিক খুরশীদের পড়ুন এখানে
চরু হক এর কবিতা পড়ুন এখানে
প্রেমাাংশু শ্রাবণের কবিতা পড়ুন এখানে
সোমা দে'র নিবন্ধ পড়ুন এখানে
সিকান্দার কবিরের কবিতা পড়ুন এখানে
তমিজ উদ্দীন এর কবিতা পড়ুন এখানে
আমিনুল ইসলামের কবিতা পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks