সন্দীপ গোস্বামী'র গুচ্ছ কবিতা
মানচিত্র
বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে নিমগাছ
নারকেল পাতা থেকে খসে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা প্রাণ
আকাশে যুদ্ধ আর্তনাদ থেমে ভেসে যায়
শান্তির সাদা মেঘ, লাল চোখ পায়রা...
স্টিলের জানালার ঠিক সামনে
নিম আর নারকেলের শূন্যতায় ভেসে আসে মানচিত্র
বাসর জাগা রমণীর মতো সে তাকিয়ে, স্পষ্ট লেখা
ইন্ডিয়া - আমাদের ভারতবর্ষ !
বাতাস নিয়ে এল প্রাচীন গন্ধ
কত যুগ, কত কালের সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি
মহামানবের মিলন উষ্ণতা
মানচিত্রের অণু পরমাণুতে মানুষের মুখ
আমাদের ভারতবর্ষ !
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মিশে গেলাম
মানচিত্রের অণু পরমাণুতে
অস্তিত্বের অস্তিত্ব বোধদয়
তারপর ঘোর আর ঘোর
ঋতু বৈচিত্র্য নেই
ছয় মিলে সাতের আভাস
বিন্দু বিন্দু আলোয় গাণিতিক সংখ্যা
আড়ালে মেঘ, পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য
কত গ্রাম, নগর, নদী, তাঁবু
মহাজাগতিক পথ ! দৃশ্য থেকে দৃশ্য
সময়ের অনুগত !
প্রথম দেখা
সময়চক্রের উৎসারিত ধ্বনির মূর্ছনায়
দৈববাণী হোল সে এসেছে
জন্মান্তরে বিরহকাতর ব্যক্তিত্ব
শব্দহীন, দৃশ্যহীন, অলৌকিক...
সে কী শুধুই মানবী!
জনকলরবে অচেনাদের মিছিলে খোঁজা
অবিরাম সভ্য আলোয়
আর দূরত্বহীন শব্দে ।
মনশ্চক্ষের নীল আলোয় ভেসে ওঠে
সেই মুখ -
দীপ্তিময়, অসীম ক্লান্তির বলিরেখা
ঠোঁট জুড়ে ঐতিহাসিক হাসি
দীর্ঘ আড়ষ্টতার পর্দা খুলে
পদ্মকুঁড়ির মতো ছড়িয়ে পড়ে
যুগ-যুগান্তরের দৃষ্টি
সে চেয়ে আছে নিষ্পলক, অবিশ্রাম
আরও কতক্ষণ, কতকাল, সময়হীন...
অশান্ত লক্ষ মুহূর্তের প্রতিবিম্ব !
কবি কে
কবি কে!
কবি এই জগতে সেই ব্যক্তিত্ব
যার কোন তুলনা নেই...
ঠোঁট, কণ্ঠ, হৃদয়, মস্তিষ্ক নয়
যার ভাষ্যের উৎপত্তিস্থল
আত্মা!
প্রকৃত অর্থে তার ভাষ্য
সর্ব-শক্তিমানের বাণী
যা চিরন্তন সত্য!
কবি কোনও দেশ, রাজনৈতিক দল
এমন কী কোন মতবাদেরও অংশ নন !
কবি নিজেই পৃথক জগৎ এবং মতবাদ
সৃষ্টি করেন...
তিনি এই জগৎবাসীর যথার্থ
নেতা এবং পথ-প্রদর্শক!
যুদ্ধ
কথা ছিল যুদ্ধ হবে
ধার্মিকদের সাথে দুষ্কৃতিদের
কথা ছিল যুদ্ধ হবে
ঈশ্বর বিশ্বাসীদের সাথে ঈশ্বর বিদ্বেষীদের
কথা ছিল যুদ্ধ হবে
সংস্কৃতির সাথে অপসংস্কৃতির, সভ্যতার সাথে অসভ্যতার, ধর্মের সাথে অধর্মের, সত্যের সাথে মিথ্যার,
মানুষের সাথে অমানুষের...
আমরা এমন বুদ্ধিমান যে
প্রতিদিন যুদ্ধ করছি
নিজের ছায়ার সাথে
যে ছায়া আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রতীক!
মানসী
কালপুরুষ তুমি কী জান তার কথা
স্নিগ্ধ সেই মুখ, স্পর্শহীন রোমান্টিকতা
আশ্চর্য মেঘের মতো না যায় ছোঁয়া
ভেসে বেড়ায় কত অনুভূতি
বারবার হাতছানি দেয় নবলোকে
নিকট কী দূর জানে না তার চোখ
শুধু জুড়িয়ে দেয় শতাব্দী ক্লান্ত মন
তারপর জীবন জিজ্ঞাসার উত্তর
সমুদ্র অতলে খুঁজে বেড়ায় গল্পগাথা
কালপুরুষ তুমি কী জান রূপকথা!
বাংলার নদীতে, আসামের চা বাগানে
বেতাইয়ের অরণ্যে, হয়ত মায়াবী নগরীতে
তাকে দেখেছিল অন্য একজন
যে বলেছিল তার কথা, কত ইতিহাস
আমি জেনেছি অনেক মিলেছে প্রচুর
তবু সে অন্যরকম -
মধ্যরাতে মেলে ধরে সোনালী আলো
আকাশ তারায় চেয়ে দেখি তাকে
মনের কাগজে লিখে দেয় কত কথা
কালপুরুষ তুমি কী জান তার ব্যাথা!
আমি প্রেমে পড়ি
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই শিশুটির প্রতি, সে খেলার পুতুলকে আপন ভেবে
বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে বিছানায় ।
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই কিশোরীর প্রতি, আয়নায় নিজেকে দেখে সে হাসে
মনে মনে বলে, কী সুন্দর আমি!
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই তরুণীর প্রতি, সে সন্তানের নরম হাত ধরে নিয়ে যায় স্কুলে
স্বপ্ন দেখে, আমার সোনা যেন দুধে-ভাতে থাকে।
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই যুবকের প্রতি, রক্তদান করে সে গর্বিত হৃদয়ে ভাবে
এবার হবে অচেনা, অজানা কোন মানুষের সাথে রক্তের সম্পর্ক ।
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই পিতা-মাতার প্রতি, উদ্বিগ্ন হৃদয়ে তাঁদের রাত কাটে
প্রবাসী সন্তানের চিন্তায় ।
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
সেই শিক্ষিত যুবক-যুবতীর প্রতি, যারা উচ্চকণ্ঠে বলে
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই, চাই ন্যায়, চাই সমৃদ্ধি
কখনও প্রগতি ময়দানে, কখনও শাহবাগে, কখনও ওয়াল স্ট্রিটে...
আমি প্রেমে পড়ি বারবার
আমার কবিতার সাথে, ও ছড়িয়ে দেয় আমার ভালোবাসা
অন্য মানুষদের হৃদয়ে। পেতে থাকি নবজন্ম!
আমি বারবার প্রেমে পড়ি
তোমার নিস্পাপ, সরল মুখের প্রতি, শত দুঃখেও যে বলে
"আমি আছি, তুমি আছো আর আছে আমাদের ভালোবাসা
পৃথিবী আবার শান্ত হবে!"
আগন্তুক
জানি না! হঠাৎ এক আগন্তুক নাড়িয়ে দিল
আমার সমস্ত সংস্কার
বৃষ্টি ভেজা বিকালে তাকিয়ে আছি
নিস্তব্ধ রাস্তার বুকে জমা ক্ষত
এতকাল লুকিয়ে রাখা অন্ধকার সরিয়ে
সেই আগন্তুক দৃশ্য ।
কোন কথাই সে বলে না
শুধু চেয়ে থাকে ধুলোজমা আমাতে
আমি প্রশ্ন করি, তুমি কে ? কী তোমার পরিচয় ?
সে শুধুই চেয়ে থাকে - বোবা দৃষ্টি!
বুঝতে পারি না এত পর্যবেক্ষণ কেন!
তার চোখ থেকে ঝরে অশ্রু
তবু আমি অবাক! প্রশ্নের উত্তর নেই ।
আমি যখন একা থাকি
সে আসে, আমি একা একাই কথা বলি
কত শব্দ নিয়ে খেলা করি ...
সে এখন আমার সাথেই থাকে ।
কবিতা
মেয়েটি খুব সুন্দর
ভরাট মুখ, গভীর চোখ, দীর্ঘ কেশ, মিষ্টি হাসি
দেহের গঠন আকর্ষণীয়, কণ্ঠস্বর রহস্যময় সুন্দর
মেয়েটি ভাষাবিদ
নোয়াখালীর অদ্ভুত বাঙাল থেকে হিন্দি, ইংরাজির শুদ্ধ উচ্চারণ
পবিত্র সরকারকেও চমকে দিতে পারে !
মেয়েটির প্রতিভা নিয়ে কোন সংশয় নেই
বিরল বহুমুখী প্রতিভা ওর রক্তে, ঠোঁটে...
মেয়েটির নাম কবিতা
সে স্বপ্ন দেখত, ওর স্বামী যেন কবি হয়
অক্ষরের কবিতার মতো ওকে ভালবাসবে
মেয়েটি কখনও ভাবত ওর স্বামী কৃষক হবে
বিকালে জমি থেকে মাটির ঘরে ফিরে আসবে
ও গামছা দিয়ে ঘাম মুছে দেবে...মোটা চালের ভাত রেঁধে খাওয়াবে
মেয়েটি এমন অনেক স্বপ্ন দেখত
স্বপ্ন আনন্দ দেয়, স্বপ্ন আদর করে, স্বপ্ন হারিয়ে যায়...
মেয়েটি এখন ইংরাজির অধ্যাপিকা
ওর স্বামীও উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী
সুখি, স্বচ্ছল, সুশিক্ষিত পরিবার নিয়ে সে খুব ভাল আছে
এখন মেয়েটি আর কোন স্বপ্ন দেখে না
স্বপ্ন দেখার মতো সময় ওর নেই ।
সেই ছেলেটি
সেই ছেলেটির কথা মনে আছে
রেললাইনের ধারে বসে ধানের বুকে ঢেউ দেখত
লাইনে কান পেতে মাইল মাইল দূর শব্দ শুনত
আর পাকা আমের গন্ধ বুকে নিত ।
সবাই ভাবত ছেলেটি পাগল
কোন কাজে মন নেই, খালি আকাশ দেখে
তারা গোনে, ঘাসের সাথে কথা বলে
ছুটে পালিয়ে যায় নদীর দিকে, জমির পিছন জয়ন্তী পাহাড়।
বৃষ্টিভেজা মাটির রাস্তায় সে নাচতে নাচতে
সবাই ভাবত আছাড় খাবে
ও চলত শূন্য প্রান্ত মাটি ছোঁয়া আকাশ দেখতে
ও আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল ।
সবাই পণ্ডিত হতে চায়, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার
শিক্ষক, অফিসার, খেলোয়াড় কত কিছু
সবার হাজার হাজার নিজের স্বপ্ন
ছেলেটি শুধু কবি হতে চেয়েছিল ।
সেই ছেলেটি আকাশ দেখতে চেয়েছিল
কত অজানা তারাদের বন্ধু হবে ভেবেছিল
সে কোনদিন মানুষ হতে চায়নি, কবি হতে চেয়েছিল
এখন নিজেই আকাশ হয়ে গেছে...
আবিষ্কার
আকাশে গোপন তারার স্নিগ্ধ আলোয় দেখেছিলাম
পূর্ব মুখে তোমার লাল আভা - জোনাকির চকিত বিচ্ছুরণ
আরও কত মনের আলোয় তোমায় শুধু তোমায়
ফরাসি নদীর স্পষ্ট অনুভবে দেখেছি সেই দিন
শ্যামলী, ভাবিনি তোমায় নিয়ে কবিতা লিখব
মাপা হাসি ঠোঁটে তুমি বলেছিলে
আমি তোমার আবিষ্কার !
প্রতিনিয়ত জমা প্রেম তৈরি করবে যে আকর্ষণ
তার নিস্তব্ধ আলিঙ্গন আমাকে করবে বন্দি
একটু একটু করে ঝরে পড়বে আশাতীত সাফল্য
তুমি গর্বিত চাহনিতে মাপবে আমায়
আমি কী বৃদ্ধি পেয়েছি
নাকি তোমার নিজস্বতায় আছি ।
ডেস্টিনি
মানুষটি আকাশকে খুব ভালোবেসেছিল, মহাকাশবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিল।
মন ভাসিয়ে দিয়েছিল অনন্ত দিগন্তে, নক্ষত্রে, চাঁদে, আকাশগঙ্গায়...
তবু সে কোনদিন আকাশকে জড়িয়ে ধরতে পারেনি।
মানুষটি নদীকে খুব ভালোবেসেছিল,
নদীর জলে হাবুডুবু খেতে খেতে সে মরতে বসেছিল।
মানুষটি জাত প্রেমিক, শুধু ভালোবাসতে জানে।
সে প্রকৃতিকে ভালোবাসে, ভালোবাসে পশুপাখি, মানুষ, গ্রন্থ, সঙ্গীত, থিয়েটার, রেলগাড়ি, উৎসব...
প্রেমিক মানুষটি সকাল থেকে রাত একটি স্টেশনারি দোকান চালায়।
যার নাম দিয়েছে 'ভালোবাসা'।
ঐ যে নীল আকাশ, সূর্য, মেঘ, রামধনু
রাতের আকাশে মূর্তিমান নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহরাশি, কালপুরুষ,
গৌরগঙ্গা, কর্মমন্দিরের মাঠ, খাল, বিল, জমি
সবাই আমার আত্মীয়।
মন্দির শহরের প্রতিটি বিগ্রহ, লাইব্রেরির প্রতিটি গ্রন্থ,
স্কুল, কলেজ, রেলস্টেশন, ফেরিঘাট
ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, পথচারী
সবাই আমার আত্মীয়।
চেয়েছিলাম এমন একটি বিশ্ব
যেখানে বর্ডার থাকবেনা, থাকবেনা সেনাবাহিনী,
পুলিশ, আদালত....
থাকবে শুধু বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসা, আত্মীয়তা।
প্রত্যেকের দু'চোখে থাকবে স্বপ্ন
শরীরজুড়ে উদ্যম, উষ্ণতা, স্বর্গীয় হাসি, প্রশান্তি...
জেনেছিলাম আমার পিতৃপুরুষ মহাপণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম!
মাতৃপুরুষ ছিলেন বৈষ্ণব চূড়ামণি অদ্বৈত আচার্য!
আজ আমার সামনে এঁরা কেউ নেই
অন্ধকারে পথ খুঁজি সভ্যতায়, আদিমতায়, অক্ষমতায়...
জেনারেশন
আমরাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জেনারেশন
যারা আজও স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, একটু ভালোবাসার জন্য পথের দিকে চেয়ে থাকে...
আমরাই সেই মৌলিক জেনারেশন
যারা মানুষের অন্তর দেখতে পেয়ে অভিমানের কবিতা লেখে...
আকাশের নক্ষত্রের সাথে বন্ধুত্ব করে, নদীর গান শোনে!
আমরাই সেই জেনারেশন যারা শত মানুষের সাথে মিশতে ভালোবাসে, আবার একাকীত্বেও শান্তি পায়...
আমরাই সেই জেনারেশন, যারা অভিমানী, আবেগপ্রবণ হয়েও বাস্তবকে হাড়েমজ্জায় চিনি!
আমরাই সেই অপূর্ব জেনারেশন, যাদের সমাপ্তিতে পৃথিবীর সব শুভ আলো নিশ্চিত নিভে যাবে...
আমরাই লিখি আমাদের ইতিহাস!
আরো পড়ুন.....
সুনির্মল বসু'র গল্প পড়ুন এখানে
গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতা এখানে
ইলিয়াস মাহমুদের প্রবন্ধ এখানে
সাজ্জাদ সাইফের কবিতা এখানে
কালরাতের কালো গল্প পড়ুন এখানে
ঢাকার আঞ্চলিক কবিতা পড়ুন এখানে
অন্ধকারের বোতাম খুলে পড়ুন এখানে
প্রকান্ড ও ক্ষুদ্র অহংকারের বিরুদ্ধে পড়ুন এখানে
সাহিত্য আড্ডা নিয়ে রিভিউ পড়ুন এখানো
এসডি সুব্রত'র বই ও কবিতা পড়ুন এখানে
অনিন্দ জসীম এর বই ও কবিতা পড়ুন এখানে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thanks