তানভীর আহমেদ হৃদয় এর গুচ্ছকবিতা।। poems by tanvir ahmed hridoy. Kuasha

    

তানভির আহমেদ হৃদয়।। কবি

তানভীর আহমেদ হৃদয় এর গুচ্ছকবিতা 


স্ক্রল করতে করতে

প্রতিদিন আঙুলের নিচে পৃথিবী বদলে যায়
—যুদ্ধ, মৃত্যু, নির্বাচন, ধর্ষণ, বন্যা; তারপর
একটি বিড়ালের ভিডিও।
আমরা দু'সেকেন্ড থেমে শোক করি, তিন
সেকেন্ড পরে বিজ্ঞাপনে চলে যাই।
মানুষের কান্নাও এখন অ্যালগরিদম বুঝে প্রচারিত হয়।
যে মৃতদেহ বেশি দেখা হয়, সে-ই বেশি
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ।
স্ক্রল করতে করতে হয়তো একদিন নিজের মৃত্যুর
খবরও পাশ কাটিয়ে যাব।

স্ক্রিন তখন  জিজ্ঞেস করবে—তুমি কে?


উন্নয়নের পোস্টার

রাস্তার পাশে বিশাল পোস্টারে হাসছে
একটি ভবিষ্যৎ, আর পোস্টারের নিচে
ঘুমিয়ে আছে বর্তমান।
উড়ালসেতুর ছায়ায় একজন মানুষ হাত
বাড়িয়ে চায় রাতের খাবার।
মাথার ওপর দিয়ে দ্রুত চলে যায় উন্নয়নের গাড়ি।
পরিসংখ্যান বলে দারিদ্র্য কমেছে—ক্ষুধার্ত
মানুষটি সংখ্যাটা পড়তে পারে না।

নতুন শহর তৈরি হচ্ছে, পুরোনো মানুষগুলো
কোথায় যাচ্ছে কেউ জিজ্ঞেস করে না।
শুধু পোস্টারগুলো প্রতিদিন আরও বড় হয়, আর মানুষের মুখগুলো হয় আরও ছোট।


তোমার দিকে তাকিয়ে

যেদিন থেকে তোমার মুখের দিকে তাকিয়েছি
সেদিন থেকে আর আকাশ দেখি না—
নক্ষত্রেরা কেবল তোমার চোখের ভেতর
নিজেদের হারানো ঠিকানা খুঁজে ফেরে।
চাঁদ উঠে, অথচ জানালার পর্দা নড়ে না;
তোমার নিঃশ্বাসেই রাতের সমস্ত বাতাস।
স্পর্শহীন হাত দুটো তবু তোমার শরীরের
উষ্ণতার ভাষা শিখে যায়।
ভালোবাসা কোনো নাম নয়—
তোমাকে দেখার পর পৃথিবীটাকে অন্যরকম মনে হওয়া।


নীরবতার কারখানা

প্রকৃতি প্রতিদিন কিছু মানুষ তৈরি করে, তারপর তাদের মুখ থেকে ভাষা খুলে নেয়।
হারিকেনের চিমনির মতো দাঁড়িয়ে থাকে তাদের মেরুদণ্ড—কালো, উষ্ণ, ধোঁয়াভরা।
সংবাদে আগুন লাগে, কিন্তু রান্নাঘরে ভাত থাকে না।
রাষ্ট্র তখন টেলিভিশনের পর্দায় হাসে।

একটি শিশু ক্ষুধার্ত অবস্থায় ভবিষ্যৎ মুখস্থ করে।
আমরা নীরবতার কারখানায় তৈরি সবচেয়ে সফল পণ্য।

মানুষ এখন প্লাস্টিকের বোতলের মতো—ব্যবহারযোগ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, তারপর অপ্রয়োজনীয়।
ভালোবাসা শেষ হলে ইনবক্স পরিষ্কার করা হয়, স্মৃতিগুলো ডিলিট করা হয় এক ক্লিকে।
কেউ কারও মৃত্যুর খবরেও একটু থেমে থাকে না।
শুধু একটি শোকের ইমোজি রেখে চলে যায় পরের ভিডিওতে।
সভ্যতা এখন খুব দ্রুতগতির—
এখানে মানুষকে ভালোবাসার আগে তার মেয়াদ দেখে নিতে হয়।


মুখের ভেতর একটি দেশ

প্রতিদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে দেখি
মুখের ভেতর একটি দেশ আটকে আছে।
রাস্তাগুলোতে ক্ষুধা হাঁটে, দেয়ালে দেয়ালে প্রতিশ্রুতির পোস্টার।
কিছু মানুষ পতাকা হয়ে উড়ে যায় বিদেশি ব্যাংকের দিকে।
কিছু মানুষ সারাজীবন নাগরিক হয়েও এক প্লেট ভাতের অনুমতি পায় না।
আমরা দাঁত ব্রাশ করতে করতে সব রক্ত ধুয়ে ফেলি।
সকালে আবার পরিষ্কার মুখ নিয়ে বলি—দেশ ভালো আছে।


নাগরিক


মেঘ আজ নিজের ছায়াকে ভোট দেয়।

ফুটপাথে পড়ে থাকে একটি অসমাপ্ত লগইন।
নিজেকে সার্চ করি—
ফলাফল : কোনো মানুষ পাওয়া যায়নি।

দেয়াল ভেঙে জন্ম নেয় আরেকটি বিজ্ঞাপন।
আমার স্মৃতি এখন কুকিজে সংরক্ষিত।

মৃত্যু শুধু বলে—আপনার সেশন শেষ হয়েছে।


প্রেমপত্র

তোমাকে ভালোবাসি—কিন্তু বাক্যটি আমার নয়।
কোনো অদৃশ্য সার্ভার আমাদের চুম্বনের বানান ঠিক করে।

রাত নামলে চাঁদও আপডেট চায়।
আমরা দুজন পাশাপাশি থেকেও দুটো ভিন্ন স্ক্রিন।
তুমি অফলাইনে গেলে পৃথিবীটা হঠাৎ প্রাগৈতিহাসিক।
তবু হৃদয়—একটি পুরোনো বাগ—বারবার তোমাকেই খোঁজে।



শহরের ব্যাকরণ

শহরের প্রতিটি দেয়ালে একটি করে
মুছে-ফেলা মুখ।
ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হলে পথচারীরা
নিজেদের ইতিহাস পার হয়।

একটি ভাঙা ম্যানিকুইন রাতভর রাষ্ট্রের
পোশাক পরে থাকে।
বিজ্ঞাপনের নিচে জন্ম নেয় নিষিদ্ধ স্বপ্নের
ক্ষুদ্র কারখানা।
ভোর হলে ফুটপাত ঝাড়ু দেয়—শুধু পড়ে
থাকে কয়েকটি নাম।
নামগুলোর কোনো নাগরিকত্ব নেই, অথচ
তারা সবচেয়ে বেশি সত্য।


অব্যবহৃত দরজা

দরজাটি বহু বছর ধরে খোলা হয় না।
তবু প্রতিরাতে তার কপাটে এসে বসে থাকে
অন্ধকারের পাখি।
চাবির গায়ে জমে থাকে অনাগত মানুষের
আঙুলের ছাপ।
ভেতরে কোনো ঘর নেই—আছে শুধু ঘরের স্মৃতি।
সকাল হলে দরজাটি দেয়ালে মিশে যায়।
আর ইতিহাসের ভেতর থেকে আরেকটি বন্ধ দরজা 
প্রতিদিন খোলা থাকে।


আরো পড়ুন.....

অনন্ত পৃথ্বীরাজ এর রোমান্টিক কবিতা পড়ুন
একুশের একগুচ্ছ কবিতা পড়ুন এখানে
দুলাল সরকার এর গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
খৈয়াম কাদেরের কবিতা পড়ুন এখানে
মাহবুবার করিমের কবিতার পড়ুন এখানে
খসরু পারভেজের কবিতা পড়ুন এখানে
রাহমান ওয়াহিদের গুচ্ছকবিতা পড়ুন এখানে
সিদ্দিক প্রামাণিক এর কবিতা পড়ুন এখানে
আযাদ কালামের কবিতা পড়ুন এখানে

Post a Comment

Thanks

নবীনতর পূর্বতন